আজ তুর্কীতে পালিত হচ্ছে ইস্তাম্বুল বিজয়ের ৫৭৩তম বার্ষিকী

আজ ২৯শে মে। ঠিক এই দিনে, ১৪৫৩ সালে সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহের (মুহাম্মদ ২য়) নেতৃত্বে মুসলমানরা কনস্টান্টিনোপল শহর জয় করে এবং এরই মাধ্যমে তাদের হাতে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে। ২১ বছর বয়সী সুলতান বিজয়ের বেশে আদ্রিয়ানোপল গেট দিয়ে শহরে প্রবেশ করেন এবং ‘আল ফাতিহ’ তথা ‘বিজয়ী’ উপাধিতে ভূষিত হন। বিজয়-পরবর্তীতে তিনি এ শহরকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন, যা সাম্রাজ্যের শেষ দিন পর্যন্ত রাজধানী হিসেবে বহাল ছিল।

প্রায় ১৫শ বছর আগে খন্দকের যুদ্ধকালীন সময়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের কুস্তুনতুনিয়া বিজয়ের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “অবশ্যই কুস্তুনতুনিয়া এক ব্যক্তির হাতে বিজিত হবে; সেই শাসক কতই না উত্তম! আর সেই বাহিনী কতই না উত্তম বাহিনী!” (মুসনাদে আহমাদ)
রাসূলুল্লাহর এই ভবিষ্যদ্বাণীর মহান মর্যাদা অর্জন করার জন্য সাহাবিদের আমল থেকেই শুরু হয় কুস্তুনতুনিয়া অভিযান। খোলাফায়ে রাশেদিনের পরবর্তী যুগে মুয়াবিয়া (রা.)-এর আমলেই কনস্টান্টিনোপল অভিমুখে দুইবার অভিযান পরিচালিত হয়। কিন্তু দুর্ভেদ্য প্রাচীর এবং যথোপযুক্ত সৈন্য-রসদ না থাকায় মুসলমানরা সে সময় সফল হতে পারেনি। সেই অভিযানে রাসুলের প্রিয় সাহাবি আবু আইয়ুব আল আনসারী (রা.)-ও ছিলেন। বয়োবৃদ্ধ এই সাহাবি অভিযানেই অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে ইন্তেকাল করেন। তাঁর ওসিয়ত অনুযায়ী তাঁকে কনস্টান্টিনোপলের প্রাচীরের পাশেই দাফন করা হয়। উমাইয়া খেলাফতের অধীনে আরও একটি শক্তিশালী অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল খলিফা সুলাইমান বিন আব্দুল মালেকের আমলে। সেখানেও মুসলিমরা সফলতা অর্জন করতে পারেনি।

অভিযান এখানেই থেমে থাকেনি; বরং যুগে যুগে মুসলিম শাসকরা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়ে গিয়েছেন শুধুমাত্র এই শহর বিজয়ের মর্যাদা হাসিল করতে। আব্বাসীয়দের পরবর্তী সময়ে সেলজুকরা যখন মালাজগির্দের যুদ্ধে (১০৭১) বিজয় অর্জন করল, তখন সুলতান আল্প আরসলান কনস্টান্টিনোপলের সম্রাট রোমানোসকে বন্দী করেন। পরবর্তীতে বাৎসরিক বিশাল অঙ্কের জিজিয়ার শর্তে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। সেলজুকরা বিভক্ত হয়ে যাওয়ার পর রোমের সেলজুক সালতানাত কিছু উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অভিযান পরিচালনা করে। তবে শীঘ্রই তারা ক্রুসেডার এবং তাতারদের আক্রমণে বিধ্বস্ত হয়ে যায়। এর পরপরই উত্থান ঘটে উসমানীয়দের। উসমানীয় সুলতান ইয়িলদিরিম বায়েজিদ খান নিকোপলিসের যুদ্ধে (১৩৯৬) ক্রুসেডারদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। এরপর তিনি পূর্ণ শক্তি দিয়ে কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করে বসেন। কিন্তু পূর্বদিক থেকে আমীর তৈমুর লং-এর সাথে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠলে তিনি এ অবরোধ উঠিয়ে নিতে বাধ্য হন। আঙ্কারার যুদ্ধে (১৪০২) উসমানীয়দের পরাজয়ের পর সালতানাতের সামগ্রিক অবস্থা ভেঙে পড়ে। পরবর্তীতে সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ এসে বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে আবারও নতুন উদ্যোগে যুদ্ধ পরিচালনা শুরু করেন। সুলতান মুরাদ একাধিকবার কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করেন, কিন্তু অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহীদের কারণে এ চেষ্টা সফল হয়নি। সবশেষে এই সুদীর্ঘ লড়াই পরিচালনার দায়িত্ব এসে পড়ে সুলতান মুরাদের সন্তান সুলতান মুহাম্মদের ওপর এবং তাঁর শাসনামলেই কনস্টান্টিনোপল এক নতুন যুগে প্রবেশ করে। সুলতান মুহাম্মদই ছিলেন সেই প্রতীক্ষিত ব্যক্তি, যিনি রাসূলুল্লাহর সেই ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণীটি পূরণ করেন। বহুল আকাঙ্ক্ষিত এই শহরটি জয় করতে মুসলমানদের প্রায় ৮০০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সুলতান মুহাম্মদ এই দুর্ভেদ্য কেল্লার পতন ঘটান এবং আয়া সোফিয়ার সুউচ্চ প্রান্তরে হেলালের নিশান স্থাপন করেন।

বিজয়ের সময় সুলতান মুহাম্মদ মাত্র ২১ বছর বয়সী এক যুবক ছিলেন। এর আগে ১৪৫১ খ্রিস্টাব্দে সুলতান মুহাম্মদ চূড়ান্তভাবে সিংহাসনে আরোহণ করেন। বাল্যকালে তিনি প্রখর মেধার অধিকারী ছিলেন। তাঁর পিতা সুলতান মুরাদ তাঁর জন্য শায়খ আহমদ ইবনে ইসমাইল আল কোরানিকে শিক্ষক নিযুক্ত করেন। শায়খ তাঁকে ইলম ও আদবের শিক্ষা দান করেন। সুলতানের ব্যক্তিত্ব গঠনে শায়খ আক শামসুদ্দীনেরও ব্যাপক প্রভাব ছিল। তিনি তাঁকে কনস্টান্টিনোপল জয় করে রাসুলের ভবিষ্যদ্বাণী পূরণ করার স্বপ্ন দেখাতেন; তাই ছোটবেলা থেকেই মুহাম্মদের লক্ষ্য ছিল—কনস্টান্টিনোপল হবে ইসলামের দেশ।

সালতানাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার শুরু থেকেই যুদ্ধের জন্য সুলতান মুহাম্মদ ব্যাপকভাবে প্রস্তুতি নেন। তিনি সমরবিদ্যায় অসাধারণ পারদর্শী ছিলেন। সিংহাসনে বসার পর তিনি এক অপ্রতিরোধ্য নৌবাহিনী গড়ে তোলেন। প্রায় ৮২ মিটার উঁচু ‘রুমেলি হিসার’ নির্মাণ করে বসফরাস প্রণালীকে সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন করেন। সেই সাথে তিনি হাঙ্গেরীয় প্রকৌশলী উরবানকে দিয়ে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ও বিশাল কামান ‘শাহী তোপ’ নির্মাণ করান। গোল্ডেন হর্নে লোহার শিকল দিয়ে বাঁধ দেওয়ার ফলে সুলতানের নৌবাহিনী সেখানে প্রবেশ করতে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল। তখন অবিশ্বাস্য এক কৌশল অবলম্বন করে সুলতান জাহাজগুলোকে স্থলপথ দিয়ে টেনে গোল্ডেন হর্নে প্রবেশ করান। মাত্র এক রাতের মধ্যে পাহাড় ও জঙ্গল ঘেরা প্রায় তিন মাইল পথ অতিক্রম করে উসমানীয় নৌবাহিনী কনস্টান্টিনোপলের মুখোমুখি চলে আসে। বাইজেন্টাইনরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই এ অলৌকিক কাজ সম্পন্ন হয়। ফলে উসমানীয় কামানের মুখে পড়া ছাড়া তাদের আর করার কিছুই ছিল না।

১৪৫৩ সালের এপ্রিলের শুরুর দিকে সুলতান মুহাম্মদ শহরটিকে অবরোধ করেন। চতুর্দিক থেকে কামানের গোলা বর্ষণ শুরু করা হয়। তাকবীরের বজ্রকণ্ঠ এবং কামানের বিকট শব্দে বাইজেন্টাইনরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। প্রায় দুই মাস পর্যন্ত এই অবরোধ চলমান রইল। একপর্যায়ে সুলতান দেখলেন দীর্ঘ যুদ্ধে তাঁর সেনাবাহিনী ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত হয়ে পড়ছে। তখন সুলতান প্রতিটি যুদ্ধশিবিরে নিজে গিয়ে সৈন্যদের উজ্জীবিত করতে লাগলেন। তিনি বারবার সৈন্যদের রাসূলুল্লাহর সেই হাদিসের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। তিনি এই বিজয়ের জন্য এতটাই সংকল্পবদ্ধ ছিলেন যে, পেছনে ফিরে যাওয়ার কথা কল্পনাতেও আনতেন না। এমনকি পরিস্থিতি নাজুক দেখে উজিরে আজম চান্দারলি হালিল পাশা অবরোধ উঠিয়ে নিতে বলেন, কিন্তু সুলতান তা নাকচ করে দেন। তিনি গোটা সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্যে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন—

‘আমার প্রাণপ্রিয় গাজীরা! আমার ভাইয়েরা,
মৃত্যুকে পরোয়া করো না, কারণ আল্লাহর পথে মৃত্যুই শেষ নয়, বরং একটি গৌরবময় যাত্রার শুরু! যারা তাঁর পথে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে, তাদের জন্য জান্নাত অপেক্ষা করছে! আর যারা বেঁচে থাকবে, তাদের জন্যও রয়েছে মর্যাদা, সম্মান এবং বিজয়!

তোমাদের সাহস পর্বতের মতো অটল হোক! তোমাদের সংকল্প সাইমুম ঝড়ের মতো তীব্র হোক! তোমাদের তলোয়ার ধারালো হোক, তোমাদের হৃদয় পবিত্র হোক এবং তোমাদের নিশানা অব্যর্থ হোক! আকাশ তোমাদের বীরত্বের সাক্ষী হোক!
আল্লাহর জন্য! ইসলামের জন্য! কনস্টান্টিনোপলের জন্য!
আল্লাহু আকবার!’

আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করার এই উদ্দীপনায় গোটা সৈন্যশিবির তাকবীরের ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়ে উঠল।

অবশেষে ১৪৫৩ সালের ২৯শে মে আল্লাহর সাহায্যে সুলতান মুহাম্মদ বিজয়ীর বেশে কনস্টান্টিনোপল শহরে প্রবেশ করেন। এই মহান অর্জনের পর তিনি ‘আল ফাতিহ’ উপাধি লাভ করেন। তাঁর বিজয়ের খবরে যেমনিভাবে খ্রিষ্টান বিশ্ব পরাজয়ের শোকে কাতর হয়েছিল, একইভাবে গোটা মুসলিম বিশ্ব বিজয়ের আমেজে মুখর হয়ে উঠেছিল। এশিয়া এবং আফ্রিকা অঞ্চলের মুসলমানরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিল। সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহ মিশর, হেজাজ, পারস্য ও হিন্দ অঞ্চলের মুসলিম সাম্রাজ্যগুলোতে দূত প্রেরণ করে ইসলামের এই মহান বিজয়ের বার্তা পৌঁছে দেন। সর্বত্র শুকরিয়ার সালাত আদায় করা হয়, ঘরবাড়ি ও দোকানপাট সজ্জিত করা হয়, দেওয়ালে দেওয়ালে রঙ-বেরঙের পতাকা লাগিয়ে নানানভাবে এই বিজয় উদযাপনে মেতে ওঠে মুসলিম সাম্রাজ্যের মানুষেরা। বিশেষ করে মক্কার আমিরের কাছে সুলতান মুহাম্মদ অগণিত উপহার সামগ্রীসহ দূত প্রেরণ করেছিলেন। হারামাইনে ব্যয় করার জন্য এবং মক্কা-মদিনার মানুষের জন্য তিনি গনিমতের মালের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পাঠিয়েছিলেন।

বিজয়ী সুলতান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষকে এই নতুন শহরে বসতি স্থাপনে উৎসাহিত করেন, যার মধ্যে মুসলিম, গ্রিক, আর্মেনীয়, ইহুদি, স্লাভসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ছিল। তিনি বিশেষভাবে সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন যেন কোনোভাবেই অমুসলিম জনগোষ্ঠী বৈষম্যের শিকার না হয়।

শহরের অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার জন্য সুলতান ‘গ্র্যান্ড বাজার’ নির্মাণের নির্দেশ দেন, যা অল্প সময়ের মধ্যেই বাণিজ্য ও ব্যবসার একটি আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এসব দূরদর্শী প্রচেষ্টার ফলে ইস্তাম্বুল দ্রুতই তার প্রাচীন সমৃদ্ধি ফিরে পায়। বিজয়ের পর সুলতান মুহাম্মদ ইউরোপ ও এশিয়া জুড়ে বিস্তৃত একটি কেন্দ্রীভূত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, যার রাজধানী হয় ইস্তাম্বুল। পরবর্তী চার শতাব্দী ধরে শহরটি অটোমান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে টিকে ছিল। তুর্কিরা কনস্টান্টিনোপলকে ‘ইসলাম্বুল’ তথা ইসলামের শহর হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। এই ঐতিহাসিক কৃতিত্বের মধ্য দিয়ে গোটা ইউরোপে মুসলমানরা এক অপরাজেয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং গোটা বিশ্ব মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্ব ও শক্তির নিকট নত স্বীকার করে।
দিনটি উপলক্ষে তুর্কীর বর্তমান এরদোয়ান সরকার মাসব্যাপি নানা বর্নাঢ্য আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়েছে। যা ইতিমধ্যেই দেশটির বিভিন্ন শহরে উদযাপিত হচ্ছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের ফলো করুন