আজ মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর ৭৮তম মৃত্যুবার্ষিকী—মুফতি আইনুল হক কাসেমী দাবা:

1789234161657

৯৪৭ সালে ভারতভাগের বহু আগে থেকেই এই ভূখণ্ডের রাজনীতিতে দেশভাগের বীজ রোপিত হয়েছিল। উপমহাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় মূলত অখণ্ড ভারতের পক্ষে ছিল, তারা দেশভাগ চায়নি।

মূল রাজনৈতিক লড়াই ও আদর্শগত বিভাজনটি ছিল মুসলিম সমাজের ভেতরের তিনটি ভিন্ন ধারার মধ্যে। এই আলোচনাটি বোঝার জন্য তৎকালীন প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দর্শন বোঝা জরুরি:

প্রথমত, মাওলানা সাইয়িদ হুসাইন আহমদ মাদানি, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এবং উলামায়ে দেওবন্দের একটি অংশ কংগ্রেসের একজাতি তত্ত্বকে সমর্থন করেছিলেন এবং ‘মুত্তাহিদা কওমিয়াত’ বা যৌথ জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। তবে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের দর্শন ছিল, অখণ্ড ভারতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোতে মুসলিমদের স্বায়ত্তশাসন থাকবে। এর ফলে হিন্দু-মুসলিম মিলেমিশে এক রাষ্ট্রে বাস করবে এবং সংখ্যালঘু প্রদেশগুলোর মুসলিমরাও সুরক্ষিত থাকবে। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, দেশভাগ হয়ে পাকিস্তান গঠিত হলে ভারতে থেকে যাওয়া কোটি কোটি মুসলিম সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে চরম বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হবে। বর্তমান ভারতে মুসলিমদের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করলে তাঁদের সেই আশঙ্কার ঐতিহাসিক সত্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয়ত, দেওবন্দের একটি বিরাট অংশ—যার নেতৃত্বে ছিলেন মাওলানা আশরাফ আললি থানবি, মাওলানা শাব্বির আহমদ উসমানি, মুফতি শফি এবং মাওলানা জাফর আহমেদ উসমানি—মুসলিম লীগের দ্বিজাতি তত্ত্বকে সমর্থন করেছিলেন। তাঁদের মূল কথা ছিল, দীর্ঘ ব্রিটিশ শাসনে হিন্দুরা শিক্ষা ও রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছে। ফলে হিন্দুদের অধীনে মুসলিমদের স্বতন্ত্র সত্তা ও ধর্মীয় অধিকার টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। জিন্নাহ, আল্লামা ইকবাল এবং এই আলেমদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল মুসলিমদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র গঠন করা, যেখানে তারা নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে। আলেম সমাজের বিশ্বাস ছিল এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি রাষ্ট্র হবে।

তৃতীয়ত, একটি মাঝামাঝি অবস্থান নিয়েছিলেন মাওলানা আবুল আলা মওদুদি। তিনি কংগ্রেসের সেক্যুলার অখণ্ড ভারত তত্ত্ব যেমন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তেমনি জিন্নার সেক্যুলার মুসলিম জাতীয়তাবাদী ভাবধারার পাকিস্তানেরও বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি ‘আল্লাহর হাকিমিয়্যাত’ বা ‘হুকুমতে ইলাহিয়া’ তথা ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন নিয়ে জামায়াতে ইসলামি প্রতিষ্ঠা করেন, যেন ভারতভাগের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি খাঁটি ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি হয়।

ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার বিচারে এই ভিন্ন ভিন্ন দর্শনের সমীকরণটি অত্যন্ত জটিল রূপ নেয়।
মাওলানা মাদানি ও যৌথ জাতীয়তাবাদের সমর্থকদের অখণ্ড ভারতের রাজনৈতিক প্রস্তাব ভোট ও নির্বাচনের রাজনীতিতে হেরে যায় এবং শেষমেশ ভারত ভাগ হয়ে মুসলিমদের পাকিস্তান রাষ্ট্র বাস্তবায়িত হয়।

আবার অন্যদিকে, যে স্বপ্নের কথা বলে দেওবন্দের সমর্থনকারী থানবির উত্তরসূরি বিশাল আলেম সমাজ এবং মাওলানা মওদুদিকে দেশভাগের পক্ষে আনা হয়েছিল, তা-ও পুরোপুরি সফল হয়নি।

জিন্নাহ পশ্চিমা চিন্তাচেতনার সেক্যুলার আগাখানি শিয়া ছিলেন। পাকিস্তান গঠিত হলেও তা শেষ পর্যন্ত কুরআন-সুন্নাহ পরিচালিত ইসলামি রাষ্ট্র হয়নি; বরং গণতান্ত্রিক ও সেকুলার ধাঁচের একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ফলে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার তত্ত্বীয় জায়গায় দেওবন্দি আলেম ও মাওলানা মওদুদির স্বপ্ন পাকিস্তান রাষ্ট্রে প্রতিফলিত হয়নি।

তবে দিনশেষে রাজনীতি ও মানচিত্র বদলের একক নায়ক হিসেবে জয়ী হন মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ। অখণ্ড ভারত বা ইসলামি রাষ্ট্র গঠন—কোনোটাই মূল রূপ না পেলেও, জিন্নার দ্বিজাতি তত্ত্বের ওপর ভর করেই জন্ম নিয়েছিল পৃথক ভূখণ্ড পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান।

যদিও সেই পূর্ব পাকিস্তান পরে ভেঙে আজ স্বাধীন বাংলাদেশের উদ্ভব হয়েছে, কিন্তু উপমহাদেশে ব্রিটিশদের হাত থেকে বেরিয়ে মুসলিমদের পৃথক রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক সত্তা গড়ার পেছনে কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর দূরদর্শী রাজনৈতিক ভূমিকা ইতিহাসে অনস্বীকার্য হয়েই থাকবে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের ফলো করুন