আসন্ন ইসলামি বইমেলায় লিটলম্যাগ কর্নারের স্টল বরাদ্দ নিয়ে কর্তৃপক্ষের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, সিদ্ধান্ত জানাতে গড়িমসি এবং মেলা কমিটির একটি ধর্মীয়ভাবে অসহিষ্ণু অংশের আপত্তির ঘটনায় আমরা গভীর উদ্বেগ ও তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
ইসলামি বইমেলায় একটি লিটলম্যাগ কর্নার বরাদ্দের জন্য লিটলম্যাগ আন্দোলনের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানানো হচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা ও যোগাযোগ হয়েছে। সর্বশেষ বুধবার বইমেলা কমিটির বৈঠক শেষে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানোর প্রত্যাশা থাকলেও বৈঠক শেষে আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
পরবর্তীতে যোগাযোগ করা হলে মেলা কমিটির একাধিক সদস্যের কাছ থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যায়। মেলা কমিটির অন্যতম সদস্য দেওয়ান মো. মাহমুদুল ইসলাম তুষার জানান, ফাউন্ডেশন পক্ষ বিষয়টি যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারেনি এবং চিঠির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে। অপরদিকে কমিটির আরেক সদস্য আহমদ রফিক জানান, ফাউন্ডেশনই লিটলম্যাগ কর্নার বরাদ্দে অপারগতা প্রকাশ করেছে।
তবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক রেজ্জাকুল হায়দারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে ভিন্ন একটি চিত্র সামনে আসে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মেলা কমিটির প্রকাশক সদস্যদের একটি অংশ লিটলম্যাগ আন্দোলনের বিষয়ে ‘ক্লিয়ারেন্স’ দিতে অস্বীকার করেছে এবং বিগত বছরের ঘটনাবলি সামনে এনে আপত্তি জানিয়েছে। তাদের দাবি, লিটলম্যাগ কর্নার বরাদ্দ দেওয়া হলে বইমেলার ‘ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ণ হবে।
পরস্পরবিরোধী এসব বক্তব্যে প্রতীয়মান হয়, বিষয়টি নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং মেলা কমিটির একটি প্রভাবশালী অংশের মতাদর্শগত আপত্তি এর পেছনে সক্রিয় রয়েছে।
কারা লিটলম্যাগ কর্নার করতে চায়?
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন মূলধারার কওমি শিক্ষাব্যবস্থা থেকে উঠে আসা তরুণ শিক্ষার্থী, লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীদের একটি অংশ। তারা ইসলামি সাহিত্য, গবেষণা, ইতিহাস ও সমকালীন চিন্তাচর্চার ক্ষেত্রে নতুন ধরনের সৃজনশীল উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছেন।
তাদের উদ্দেশ্য ইসলামি বইমেলার পরিসর থেকে বেরিয়ে যাওয়া নয়; বরং ইসলামি চিন্তা ও সাহিত্যচর্চার ভেতরেই নতুন প্রজন্মের সৃজনশীল কণ্ঠকে সামনে নিয়ে আসা। অথচ একটি ধর্মীয় অসহিষ্ণু অংশ এই বহুমাত্রিক সাহিত্য ও চিন্তাচর্চাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারছে না।
আমরা মনে করি, মতের ভিন্নতা কোনো সাহিত্যিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগকে দমিয়ে দেওয়ার কারণ হতে পারে না। বিশেষ করে ইসলামি বইমেলার মতো একটি বৃহৎ পরিসরে চিন্তার বৈচিত্র্য ও সুস্থ মতবিনিময়ের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
বিগত বছরের ঘটনা প্রসঙ্গে
বিগত বছরের বইমেলায় লিটলম্যাগ চত্বরে বিভিন্ন মত ও পথের মানুষের যে সমাগম ঘটেছিল, একটি মহল তাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ‘ইসলামবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করে। সেই ধারাবাহিকতায় লিটলম্যাগ আন্দোলনের কর্মীদের সঙ্গে ‘গায়ে হাত তুলে’ দুর্ব্যবহার করা হয় এবং সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের উপস্থিতির জের ধরে লিটলম্যাগ কর্নারে আলো নিভিয়ে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হয়।
আমাদের অবস্থান স্পষ্ট—ওই ঘটনায় লিটলম্যাগ আন্দোলন ছিল আক্রান্ত পক্ষ, অভিযুক্ত পক্ষ নয়। ফলে বিগত বছরের সেই ঘটনাকে বর্তমান সময়ে লিটলম্যাগ কর্নার ঠেকানোর যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা হবে ঘটনার একপেশে ও বিকৃত উপস্থাপন।
আমাদের অবস্থান
লিটলম্যাগ সাহিত্য, গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যের অংশ। এর সঙ্গে যুক্ত তরুণদের কোনো উদ্যোগকে কেবল মতাদর্শগত অস্বস্তি বা ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার কারণে ইসলামি বইমেলার পরিসর থেকে দূরে রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।
ইসলামি বইমেলা শুধু বই বিক্রির জায়গা নয়; এটি ইসলামি সাহিত্য, চিন্তা ও সংস্কৃতির বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্ল্যাটফর্ম। এখানে মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে। কিন্তু ভিন্নমতকে মোকাবিলা করার পথ হওয়া উচিত আলোচনা ও যুক্তি—বাধা, অপপ্রচার কিংবা চাপ প্রয়োগ নয়।
আমাদের একটিই দাবি, কোনো ধরনের কর্তৃত্ববাদী আচরণ ছাড়া স্বাধীনভাবে লিটলম্যাগ কর্নারের জন্য স্টল বরাদ্দ দিতে হবে।
আমরা আশা করি, ইসলামী ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে দ্রুত একটি ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। অন্যথায় লিটলম্যাগ আন্দোলনের সদস্য, লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে আলোচনাক্রমে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।



