নন্দিত লেখক ও বিজ্ঞ আলেম আইনুল হক কাসেমীর “সমালোচনা মূলক প্রবন্ধ”

1783620698157

জেলখানা থেকে বের হবার কয়েকদিন পরের কথা। ইসলামি রাজনীতির সাথে যুক্ত এক মাওলানা বললেন, এবার রাজনীতি করার গুরুত্ব অনুধাবন হয়েছে? রাজনীতিতে আসুন, তাহলে বিপদে দলের সাপোর্ট পাবেন।

কিছুদিন আগেও আরেক ভাইয়ের সাথে মামলা ও জেলের কারগুজারি হলো। শেষমেশ তিনি বললেন, এবার বলেন, রাজনীতি করবেন কিনা?

ব্যক্তিগতভাবে আমি রাজনীতিবিমুখ মানুষ। তবুও প্রায়ই বিভিন্ন ইসলামি সংগঠনে নাম লেখানোর দাওয়াত আসতো। আলি হাসান উসামা ভাই খেলাফত মজলিসে আসার পর আমাকেও দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আমাকে নিয়ে আলাপ হয়েছে। বলে রাখা ভালো, আমি একসময় তুখোড়ভাবে ছাত্র মজলিস করতাম। সে আলাপ আরেকদিন করব।

যাইহোক, জমিয়ত, খেলাফত, চরমোনাই- সব দল থেকেই দাওয়াত আসতো। আর জেল থেকে বের হবার পর সেই দাওয়াতের মাত্রা আরও বেড়েছে।

এবার কিছু কথা বলি, ডোন্ট মাইন্ড…

আমাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর রাতারাতি দেশের অরাজনৈতিক অঙ্গন থেকে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে৷ ইসলামপন্থী সব মানহাজের অরাজনীতিক সেলিব্রিটিগণ এবং নানান অরাজনৈতিক সংগঠন মুখ খুলেছে। রাজনীতির সাথে যুক্ত যারা প্রতিবাদ করেছেন, তাঁরা অন্যান্যদের মতো নিতান্তই ব্যক্তিগত জায়গা থেকে করেছেন।

কিন্তু কওমি অঙ্গনের মূলধারার সংগঠনগুলো চিরাচরিত নীতি অনুযায়ী মুখে কলুপ এটে বসেছিল! চার মাস অতিবাহিত হবার পর অনেক বলাকওয়ার পর হেফাজতে ইসলাম এবং প্রাচীনতম আসলাফ-আকাবিরের একটি ইসলামি সংগঠন থেকে অফিসিয়ালি বিবৃতি এসেছে! কেন ভাই; বলেকয়ে বিবৃতি আনাতে হবে কেন? তা-ও চারমাস পর! আমি তো মূলধারার আলেমদের জুতা সোজা করনেওয়ালা এক দেওবন্দি। কোনোপ্রকার খতরনাক সংগঠন বা ফিকরের সাথে যুক্ত নই। তবুও আলহামদুলিল্লাহ। শুকরিয়া। আমি না-শুকর নই।

কিন্তু সেই একটিমাত্রই ইসলামি সংগঠন। আসলাফ-আকাবিরের সংগঠন। কিন্তু দেশে তো কওমিভিত্তিক দল এই একটাই না; আরও আছে। ওগুলো কি এই সংগঠনের দেখাদেখিও বিবৃতি/প্রতিবাদ করা শিখতে পারল না! এমনকি ইমেজ সংকটে পড়ার ভয়ও করল না?! আমি কোনো সংগঠন করি না বলে কি আমার জন্য কিছুই করার নেই?! আমি কি কওমির সন্তান নই? এসব সংগঠন কি তাহলে শুধুমাত্র নিজস্ব নেতা ও কর্মীদের জন্য? কওম ও মিল্লাতের জন্য না?!

আমার গ্রেফতারির পর থেকেই আমাদের অঙ্গনের প্রায় সব ইসলামি দলের কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের ফোন ও মেসেজ করা হয়েছে। যারা করেছেন তাদের অনেকেই দেশের খ্যাতিমান আলেম। কিন্তু নেতাদের থেকে এক আশ্চর্য নীরবতা পাওয়া গেছে! অথচ, এই নেতারাও বারবার জেল খেটেছেন। অভিজ্ঞতার ঝুলি তাদের পরিপূর্ণ। আচ্ছা দেখব; জানায়েন; দুআ করব- এ পর্যন্তই!

এবার আসুন এইসব দল কি তাদের লোকদের বিপদেও পাশে দাঁড়ায়?

আমাদের কেস পার্টনার এক ভাই কওমি অঙ্গনের একটা দলের একাংশের নিবেদিত একজন ছোটখাটো নেতা। গ্রেফতারির পর তিনি বড় আশা করেছিলেন, দল তার পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু তার আশায় শুধুই গুড়েবালি নয়; রীতিমতো অমানবিক আচরণ করা হয়. তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে দেওয়া হয়! বলা হয়, দলের পরিচয় দিলে ক্ষতি হবে! সাতটা মাস দলের কেউ তার খোঁজখবরও নেয়নি! অবশেষে ভিক্ষা করে তাকে মুক্ত করা হয়! আজ হাজিরায় সেই ভাইয়ের সাথে দেখা। বললাম, দলে ব্যাক করেছেন? বললেন, থু মারি!

জেলখানা থেকে বের হবার পরেই শুনতে পেরেছিলাম, কওমির প্রাচীন একটি ইসলামি সংগঠনের একজন কর্মী প্রায় এক যুগ পর কারামুক্ত হবার পর তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জীবনেও কেউ সেই সংগঠনের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো টু-শব্দ শুনেনি! যদিও ইদানিং সেই সংগঠনের কিছু এক্টিভিটি চোখে পড়ছে। তা-ও তীব্র সমালোচনার মুখে টিকতে না পেরে!

নরসিংদীর একজন আলেম। কওমির একটি ইসলামি দলের একাংশের স্থানীয় সেক্রেটারি। কিন্তু দল তার জন্য কিছুই করেনি। দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন। কিন্তু কারাবন্দীদের মুক্তি নিয়ে কাজ করনেওয়ালা এক ভাই তাকে মুক্ত করালেন। তিনি চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বললেন, আমার সংগঠন যা করেনি, আপনি ব্যক্তিগতভাবে সেটা করলেন!

আমার কেস পার্টনার কিছু ভাই ছিল মুসলিম ব্রাদারহুডের ভারতীয় ভার্সনের ছাত্র সংগঠনের নেতা ও কর্মী। দল তাদের জন্য সবই করেছে। কিন্তু আড়ালে। এমনকি থানা ও কোর্টে বিরিয়ানির প্যাকেটও হাদিয়া চলে আসতো। দূর থেকে, বিদেশ থেকে তাদের খোঁজখবর নেওয়া হতো। কিন্তু মোটেও দলের ব্যানার ব্যবহার করা হয়নি। ব্যানার ছাড়াই সব করা হয়েছে।

এরপর আপনিই ফয়সালা করুন, আমার জন্য রাজনীতি করা ঠিক কত ডিগ্রি সেলসিয়াস অনুচিত? কিংবা আপনার জন্য রাজনীতি থেকে কত বর্গমাইল দূরে থাকা ভালো? নির্দিষ্ট কিছু এজেন্ডা ও গৎবাধা কিছু শিরোনামের রাজনীতি করা এসব দল করে আপনি কওম ও মিল্লাতকে কী-ই বা দিতে পারবেন?

সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের ফলো করুন