প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলতে চাই এই লেখাটি কোনো ব্যক্তির সাফাই গাওয়ার জন্য নয়। একজন শিক্ষক হিসেবে আমার ছাত্র সম্পর্কে আমি যতটুকু সত্য জানি, সেই দায়িত্ববোধ থেকেই কিছু কথা বলছি। একজন ছাত্রকে হেয় করা যেমন উচিত নয়, তেমনি তাকে না জেনে বিচার করাও সমীচীন নয়। তাই একজন হুজুর হিসেবে আমার যে দায়িত্ব, সেটুকুই পালন করছি।
আজকাল আমরা প্রায়ই দেখি অনেক মেধাবী তরুণ মোবাইল গেম, নাটক-সিনেমা কিংবা বিভিন্ন অনর্থক কাজে সময় নষ্ট করে নিজেদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। আবার কিছু তরুণ আছে, যারা সেই সময়টুকু নিজেদের দক্ষতা ও ব্যক্তিত্ব গঠনে ব্যয় করার চেষ্টা করে। তামিম আল আদনান আমার দৃষ্টিতে এমনই একজন তরুণ।
তামিম আল আদনান গত বছর মাদরাসাতুল ইখলাস, ঢাকা (সানারপাড়)-এ দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি হয়। আলহামদুলিল্লাহ, অল্প সময়ের মধ্যেই সে তার মেধা, পরিশ্রম ও শৃঙ্খলার পরিচয় দেয়। দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে। পাশাপাশি বক্তৃতাতেও ভালো সাফল্য অর্জন করে এবং শিক্ষকদের সুনজর কেড়ে নেয়।
মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত অবস্থায় তাকে কখনো সাংবাদিকতায় উৎসাহিত করা হয়নি। বরং সব সময়ই তার পড়াশোনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমরা বারবার তাকে গাইডলাইন দিয়েছি, যেন কোনোভাবেই তার ইলম অর্জন, ক্লাস কিংবা পড়াশোনার ক্ষতি না হয়।
তবে ছুটির সময় অন্য অনেক তরুণের মতো গেম, নাটক বা অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট না করে সে নিজ উদ্যোগে সাংবাদিকতার জগৎ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছে। আর আমার কাছ থেকে সে ভাষা, উপস্থাপনা ও বক্তব্য প্রদানের বিষয়েই কিছুদিন তালিম নিয়েছে। যেন তার ভাষা আরও শুদ্ধ, মার্জিত ও গ্রহণযোগ্য হয়।
এ বছর সে তৃতীয় বর্ষে ভর্তি হয়। কিন্তু কুরবানির পরবর্তী প্রথম সাময়িক পরীক্ষার আগেই উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে মিশরে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মাদ্রাসা থেকে ছুটি নিয়ে বিদায় নেয়। আলহামদুলিল্লাহ, সে এখনও সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
বর্তমানে সে কয়েকটি গণমাধ্যমে কাজ করছে এবং সুযোগ পেলেই Qawmi Voice 24 সময় দেয়। বর্তমানে আমাদের সবার পরিচিত আরজে মামুন চৌধুরী সাহেবের কাছেও কোর্স করছে এবং নিজেকে আরও দক্ষ করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
মাদ্রাসায় অধ্যয়নকালে সে প্রতি মাসে নিয়মিত ৩,০০০ টাকা বেতন পরিশোধ করেছে এবং একজন ভদ্র, নিয়মিত ও দায়িত্বশীল শিক্ষার্থী হিসেবেই ছিল।
তামিমের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো সে জুলাই আন্দোলনের চেতনা ও দেশপ্রেমে গভীরভাবে উজ্জীবিত। দেশ, জাতি ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার এক ধরনের আন্তরিক আগ্রহ তার মধ্যে রয়েছে। এই উদ্দীপনা যদি সঠিক ইলম, অভিজ্ঞতা ও নৈতিকতার মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তাহলে ইনশাআল্লাহ সে সমাজের জন্য একজন উপকারী মানুষ হয়ে উঠবে।
আমরা কখনোই চাই না, সে লেখাপড়া বাদ দিয়ে শুধু সাংবাদিকতাকেই জীবনের লক্ষ্য বানাক। আমাদের আন্তরিক চাওয়া—সে প্রথমে একজন যোগ্য, হক্কানী ও আদর্শ আলেম হিসেবে গড়ে উঠুক। এরপর যদি সত্য, ন্যায় ও মানুষের কল্যাণে কলম ধরতে পারে, সেটি হবে অতিরিক্ত একটি নেয়ামত।
তামিমের পিতা আজ দুনিয়াতে নেই। তাই আমাদের দোয়া, সে এমনভাবে নিজেকে গড়ে তুলুক যাতে তার প্রয়াত পিতার জন্য সদকায়ে জারিয়া হয়, তার মায়ের মুখ উজ্জ্বল হয়, তার বড় ভাই গর্ববোধ করেন এবং আমরা যারা তার শিক্ষক, তারাও তার মাধ্যমে সম্মানিত হতে পারি।
আমরা এখনও তাকে নিয়মিত গাইডলাইন দিয়ে থাকি, যেন কোনোভাবেই সে পথভ্রষ্ট না হয়। আল্লাহ তাআলা তাকে ইলম, আমল, তাকওয়া, উত্তম চরিত্র ও হিকমতের সঙ্গে জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন।
সবশেষে একটি বিষয় সবার প্রতি বিনীত অনুরোধ তামিমের বয়স এখনও ১৮ বছর পূর্ণ হয়নি। এই বয়সে একজন তরুণের ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে বিদ্রূপ, ট্রল, অপমান বা বিতর্কিত মন্তব্য না করে, তাকে কাছে টেনে নিয়ে ভালোবাসার সঙ্গে বোঝানো, প্রয়োজনে সংশোধন করা এবং তার প্রতিভাকে সঠিক পথে পরিচালিত করাই আমাদের দায়িত্ব।
একজন তরুণকে ভেঙে দেওয়া খুব সহজ; কিন্তু একজন তরুণকে গড়ে তোলাই একজন শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন সমাজের প্রকৃত পরিচয়।
আল্লাহ তাআলা তামিম আল আদনানকে দ্বীনের একজন যোগ্য খাদেম, দেশপ্রেমিক নাগরিক এবং সত্যনিষ্ঠ মানুষ হিসেবে কবুল করুন। আমীন।
তারিখ: ২৭ জুলাই ২০২৬, সোমবার
নিবেদক,
মুফতি হুজাইফা আল মাহদী
প্রতিষ্ঠাতা ও মুহতামিম,
মাদরাসাতুল ইখলাস, ঢাকা (সানারপাড়)
(তামিম আল আদনানের হুজুর)



