শত শত বছর ধরে মুসলিমরা শাসন করে এসেছিল এই উপমহাদেশ। শাসক-প্রজাদের মধ্যে ছিলো না কোনো পার্থক্য ও তফাৎ। অভাব অনাহারে ছিলো না কোনো জনগোষ্ঠী। কি হিন্দু কি মুসলিম বিচারের কাঠগড়ায় ছিল সবাই সমান। ব্যবসা-বাণিজ্যের উৎকর্ষ সাধনে অবাক হয়ে পড়েছিল পুরো ইউরোপ বিশ্ব। অর্থনৈতিকভাবে পুরো বিশ্বে উপমহাদেশ ছিলো শীর্ষস্থানে। এদেশের হিন্দু মুসলিম সকলেই ছিল ধর্মপ্রাণ। ছিলো না রাজা প্রজাদের মধ্যে কোনো বৈষম্য। শান্তির এক আভাস বয়ে বেড়িয়েছে উপমহাদেশের প্রতিটি জনপদে। অপরদিকে, নিজেদের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে এদেশে পাড়ি জমায় বিদেশি বণিকেরা। আর তাদের এই অনুপ্রবেশ এক সময় আমাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে নানান কূটনৈতিক কৌশলে ছিনিয়ে নেয় আমাদের শাসন ক্ষমতা। আরম্ভ হয় অন্যায় অত্যাচার। বিভিন্ন কর-ট্যাক্স আরোপের মাধ্যমে জুলুন শুরু করে দিল ব্রিটিশ ইংরেজরা। ফলে, চতুর্দিক থেকে শুরু হলো ইংরেজ খেদাও আন্দোলন। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় দারুল উলুম দেওবন্দ। এরই ছাত্ররা ইংরেজ-বিরোধী ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে দিল পুরো উপমহাদেশে। জালেম শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত হলো নানান দল সংগঠন। প্রতিষ্ঠিত হলো তাবলীগ জামাত। এই জামাতের মৌলিক উদ্দেশ্য ছিলো, আমজনতার হৃদয়ে জিহাদি জজবা সৃষ্টি করে এবং মন মগজে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার চেতনা লালন করিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াকু সৈনিক হিসেবে তৈরি করা। সেই কারণে লক্ষ্য করা যায়, তাদের বিভিন্ন বয়ান ও পুস্তিকায় প্রচুর পরিমাণে আল্লাহ তায়ালার রাস্তায় জিহাদ করার আয়াত ও হাদিস।
যাহোক, অবশেষে ইংরেজরা চলে গেলো। আপামর আমজনতা সকলের আন্দোলনের সামনে টিকে থাকতে পারল না। চলে গেল তারা সকলেই। কিন্তু সাথে করে নিয়ে গেলো আমাদের মগজ মস্তিষ্ক। আর দিয়ে গেলো আমাদের মাথার ভিতরে তাদের চিন্তাও চেতনা ও আদর্শ সংস্কৃতি, যেগুলো আমরা এখনো লালন করি।
সর্বোপরি, তাবলিগ জামাত নিরীহ একটি আমল ভিত্তিক দাওয়াতি সংগঠন। এর মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন রুখে দেওয়া সম্ভব নয়। তাবলীগ জামাতের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনেক। এটা আমরা সকলেই মেনে নিয়েছি। শত হলেও আধুনিককালে মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে এর প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পেয়েছে। নিছক তাবলীগ জামায়াতে গিয়ে দাওয়াহ ও খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার মেজাজ কারও তৈরি হয় না । তার গুরুত্ব কারও বোধোদয় হয় না। তাবলিগ জামাতের প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলটির যেমন উদ্দেশ্য ছিলো উপমহাদেশ থেকে ইংরেজ খেদানো, এবং মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করা, তেমনিভাবে এখনও আমাদের জন্য উচিত , তাদের রেখে যাওয়া আদর্শ সংস্কৃতি ও চিন্তা চেতনা লালনকারী এদেশের মানুষদেরকে খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব বোঝানো। তারপর হয়তো বিদেশ সফর!
আমরা যে যেই বা সেক্টরে আছি, কেউ খানকায়, কেউ তাবলিগে অথবা কোনও ইসলামিক রাজনৈতিক দলে। আমাদের সকলেরই নিজেদের কর্মীদেরকে দাওয়াহ খিলাফাহ-এর গুরুত্ব বোঝানো আবশ্যক। ব্যাপকহারে সামাজিকভাবে দাওয়াহর কাজ চালিয়ে যাওয়া। মনে রাখতে হবে, সমাজের অধীনে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের অধীনে সমাজ নয়। সমাজ ঠিক তো রাষ্ট্র ঠিক।
বিদেশ সফরে, আমরা যে পরিমাণ অর্থ, সময় ও মেধা ব্যয় করি, সেগুলো যদি আমরা নিজেদের সমাজের যুবকদের পিছনে ব্যয় করি, এবং প্রত্যেকেই যদি প্রত্যেক সমাজের দশজন যুবককে টার্গেট করি কাউন্টার করি এবং তাদের পিছনে দাওয়া ও খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার মেহনত করি। গরিব হলে আর্থিক যোগান দিতে পারি। বিপদে তাদের পাশে যদি দাঁড়াতে পারি। আর এভাবেই যদি প্রতিটি মহল্লায় বা প্রতিটি সমাজে দশজন দশজন করে টিম তৈরি হয়ে যায়, তা হলে আশা করি, আমরা অচিরেই এর সুফল ভোগ করতে পারব। প্রিয় ভাই, বিদেশে আরাম-আয়েশে সফর না করে নিজেদের মহল্লায় যদি সময় ও মেধা খাটাই। যুবকদের পিছনে অর্থ বিনিয়োগ করি । তা হলে আমরা আমাদের বয়ান ও পুস্তিকায় ব্যবহৃত ফজিলতপূর্ণ জিহাদের আয়াত ও হাদিসের মিসদাক হতে পারব। এর সওয়াবের আশা করতে পারব। অন্যথায় এসমস্ত আয়াত ও হাদিস বর্ণনা করা দীন বিকৃতির নামান্তর। বিদেশে আমাদের সফর একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্যই তো। উম্মতের ফিকিরের জন্যই তো বিদেশ সফর। তা হলে এ মেহনত মুজাহাদা নিজেদের মহল্লায় নয় কেনো। আমরা কেনো নিজ জাতির এই ক্রান্তিকালে বিদেশ সফরে ব্যস্ত। আমাদের সমাজগুলোতে দীনের চাহিদা নেই? কেউ কি দারিদ্র্যপীড়িত নয়? বিদেশে সফরের জন্য জোগানো অর্থ-সম্পদ তাদের পিছনে বিনিয়োগ করতে পারি না! সেটাও তো আল্লাহর রাস্তা। এভাবে যদি তাদের পাশে থেকে খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার কাজ করতে পারি। তবে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, সমাজের চেহারাই পাল্টে যাবে।
এখানে এসে অনেক ভাই অনেক আপত্তি তুলতে পারে, কিন্তু আমি কখনও বলিনি, বিদেশ-সফরে কোনো ফায়দা নেই। তবে এ কথা মনে রাখতে হবে, যুগ-সময় ও উম্মতের চাহিদা, সমস্যা বুঝতে হবে। এখন থেকেই যেনো দীনের প্রতিটা সেক্টর থেকে কর্মীদেরকে মাঠ-পর্যায়ে ব্যাপকহারে কার্যত দাওয়াহর সিস্টেম ও প্রক্রিয়া তৈরি করতে নির্দেশ করে। আমাদের টার্গেট এখন নিজেদের সমাজ ও রাষ্ট্র।
উদ্দেশ্য, দাওয়াহ ইলাল জিহাদ, দাওয়াহ ইলাল খিলাফাহ।



