ভারত নিজের দেশে মসজিদ ভাঙছে শ’য়ে শ’য়ে, কিন্তু প্রতিবাদ করছে পাকিস্তানের একটি মসজিদ ভাঙার  

1788793814320

লাহোর থেকে ১৩০ কিলোমিটার দূরে নারওয়াল জেলায় একটি ১০০ বছরের পুরানো হিন্দু মন্দির ভেঙে দেয়া হয়েছে দিন দশেক আগে। পাকিস্তানের একটি সংখ্যালঘু অধিকার সংগঠন বলেছে একদল (মুসলমান) লোক মন্দিরটি ভেঙেছে। আর সরকারী তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে মন্দিরটি অনেক বছর আগেই আংশিক ধসে গিয়ে জীর্ণ অবস্থায় ছিলো এবং বৃষ্টির জন্য সম্পূর্ণ মাটিতে মিশে গিয়েছে। সম্প্রতি কেউ ওই মন্দিরের উপর আক্রমণ করেছে তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করা হবে, পাকিস্তানের সংখ্যালঘু দফতরের মন্ত্রী জানিয়েছেন।

ভারতের সংবাদ মাধ্যমে গতকাল থেকে পাকিস্তানের ওই মন্দির “ভেঙে দেয়ার” ঘটনাকে নিন্দা করে অনেক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। ভারতের হিন্দু কট্টরপন্থী বজরং দল বিক্ষোভ মিছিল করেছে এই মন্দিরের উপর “আক্রমণের” প্রতিবাদে। বুধবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রকও নারওয়ালের মন্দির ভাঙার কড়া নিন্দা করে পাকিস্তান সরকারকে মন্দির পুনরায় নির্মাণ করে দেয়ার দাবি করেছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয়রাও বিষোদ্গার করছে।

ভারতে ১৯৯২ সালে হিন্দুত্ববাদীরা অযোধ্যার বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়ার পর ভারতের প্রতিবেশী দেশ, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে, প্রতিবাদের ঝড় ওঠার পর ভারতের সরকার ও বিভিন্ন হিন্দু সংগঠন প্রতিক্রিয়া জানায় যে ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে অন্য দেশ থেকে আসা প্রতিবাদে তাদের কিছু যায় আসে না। অথচ ভারতের শাসক দল বিজেপি ও অন্যান্য হিন্দুত্ব সংগঠন পাকিস্তানের নারওয়ালের মন্দির ভাঙার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে।

নারওয়ালের মন্দির যদি কেউ ভেঙেও থাকে তা হতে পারে কিছু সাধারণ মানুষ বা মুসলিম। সরকারের কোনো এজেন্সী এই মন্দির ভাঙেনি বা যারা ভেঙেছে তাদেরকে সুরক্ষা দেয়নি বা আড়াল করেনি। কিন্তু ভারতে, বিশেষ করে বিজেপি-শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে গত এক দশকে কয়েক হাজার মসজিদ-মাদ্রাসা-মাজার-এতিমখানা হিন্দুত্ববাদীরা ও সরকার একসাথে মিলে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

বাবরি মসজিদের ক্ষেত্রে হিন্দুত্ববাদীদের দাবি ছিলো যে একটি রামমন্দির ভেঙে ঠিক ওই জায়গাতেই ষোড়শ শতাব্দীতে ওই মসজিদ তৈরী করা হয়েছিলো এবং ঠিক ওই স্পটেই রামের জন্ম হয়েছিলো। ওই মসজিদের জমির অধিকার দাবি করে মুসলমানেরা পরে মামলা করলে ভারতের সুপ্রীম কোর্ট হিন্দুদের হাতে ওই জমি তুলে দেয়। কোর্ট তার নিরীক্ষণে জানায় যে যদিও কোনো হিন্দু মন্দির ভেঙে ওই জায়গাতেই মসজিদ তৈরী করা হয়েছিলো মোঘল আমলে তার প্রমাণ হিন্দু পক্ষ দিতে পারেনি। তা সত্ত্বেও, রাম ঠিক ওই স্থানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন—হিন্দুদের এই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে সুপ্রীম কোর্ট বাবরি মসজিদের জমি সংক্রান্ত মামলায় হিন্দুদের পক্ষে রায় দেয়। ওই জায়গাতেই তৈরী হয়েছে এখন রাম মন্দির।

হিন্দুত্বপন্থীদের দাবি যে মথুরার শাহী মসজিদ যেখানে তৈরী হয়েছিলো সপ্তদশ শতাব্দীতে ঠিক সেই জায়গাতেই হিন্দু দেবতা কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিলো। ওই মসজিদও হিন্দুদের হাতে তুলে দেয়া হোক ওখানে কৃষ্ণ মন্দির তৈরীর জন্য তারা দাবি করেছে। ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত দেওবন্দের ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র দারুল উলুম দেওবন্দও প্রাচীন শিব মন্দির ভেঙে তৈরী হিন্দুত্ববাদীরা দাবি করেছে এবং ওই শিক্ষাকেন্দ্রের জমির অধিকার দাবি করেছে।

ভারতে হিন্দুত্ববাদীরা তো মসজিদ-মাজারে ভাংচুর করে চলেছেই, তার সাথে সাথে বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপি সরকারও মুসলমানদের ধর্মীয় স্থাপনার উপর বুলডোজার আক্রমণ জারী রেখেছে। সরকারী তরফ থেকে ভারতে বুলডোজার দিয়ে মসজিদ ধ্বংসের কোন পরিসংখ্যান নেই। তবে বেসরকারী হিসাবে শুধু বিজেপি-শাসিত রাজ্য উত্তরাখণ্ডে সম্প্রতি এক বছরে ৫৩৭ টি মসজিদ, মাদ্রাসা, মাজার ইত্যাদি বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করেছে সরকার সেগুলিকে অবৈধ ঘোষণা করে। যদিও মুসলমান পক্ষ অনেক ক্ষেত্রে কাগজপত্র দেখিয়ে সেই ইসলামিক স্থাপনাগুলিকে বৈধ দাবি করেছিলো সরকারের তরফ থেকে ঐসব দাবি অগ্রাহ্য করা হয়।

ঐতিহাসিক রিচার্ড ইটনের মতে মধ্যযুগে আশিটার মতো মন্দির মুসলমান আমলে ভাংচুর বা ধ্বংস করা হয়েছিলো। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী নেতাদের দাবি এই দেশে মুসলমান বাদশারা অন্ততঃ তিরিশ হাজার হিন্দু মন্দির ভেঙে সেগুলোর বেশীর ভাগের উপর মসজিদ তৈরী করেছিলো। এক এক করে ওই তিরিশ হাজার মন্দিরের জমি পুনরুদ্ধার করে হিন্দুত্ববাদীরা সেখানে সব মন্দির পুনর্নির্মাণ করবে তাদের অনেক নেতা বাবরি মসজিদ ভাঙার সময় থেকে হুমকি দিয়ে আসছে। এটি স্পষ্ট যে ভারতে হিন্দুত্ববাদীদের উত্থানের সাথে সাথে মসজিদ-মাদ্রাসা ধ্বংসের খেলা চলতেই থাকবে ইসলামকে ভারত থেকে মুছে দিয়ে হিন্দু রাষ্ট্র তৈরীর লক্ষ্যে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের ফলো করুন