বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
সম্মানিত সাংবাদিকবৃন্দ, লেখক, প্রকাশক, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী ও উপস্থিত সুধীজন—আসসালামু আলাইকুম।
আসন্ন ইসলামি বইমেলায় লিটলম্যাগ কর্নার নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, আজকের সংবাদ সম্মেলনে আমরা তার কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাই।
১. এটি নতুন কোনো দাবি নয়
২০২২ সাল থেকে ইসলামি বইমেলার আয়োজনে লেখক কর্নার, মহিলা কর্নার, শিশু কর্নার ও লিটলম্যাগ কর্নারের দাবি জানিয়ে আসছি। গত বছর লিটলম্যাগ কর্নার বইমেলার অংশ হিসেবেই দেওয়া হয়েছিল। আমরা কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক স্টলের আবেদন করে সেটি নিইনি; মেলা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগেই কর্নারটি দেওয়া হয়েছিল। এবারও আমরা সেই ধারাবাহিকতাই প্রত্যাশা করেছি।
২. লিটলম্যাগ কর্নার আর সাধারণ স্টল এক নয়
আমরা কোনো বাণিজ্যিক স্টল চাইছি না। লিটলম্যাগ কর্নার হলো তরুণ লেখক, সম্পাদক, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীদের প্রকাশনা ও চিন্তাচর্চার একটি বিশেষ পরিসর। তাই সাধারণ স্টল বরাদ্দের নিয়মের সঙ্গে লিটলম্যাগ কর্নারকে এক করে ‘আবেদন করেনি’ বা ‘প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি’—এ ধরনের প্রশ্ন তোলা আমাদের কাছে স্বাভাবিকভাবেই বিস্ময়ের। কারণ, আমাদের কখনো বলা হয়নি যে লিটলম্যাগ কর্নার নিতে হলে সাধারণ স্টলের মতো আবেদন করে নির্দিষ্ট অর্থ জমা দিতে হবে। বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগে আমরা কর্নার পাওয়ার আশ্বাসই পেয়েছি।
৩. আমরা কি যোগাযোগ করিনি?
লিটলম্যাগ কর্নারের দায়িত্বশীল জায়গা থেকে নকীব মাহমুদ নিয়মিতভাবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
২৮ জুলাই মেলা কমিটির দায়িত্বশীল দেওয়ান মো. মাহমুদুল ইসলাম তুষারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং কর্নারের বিষয়ে আশ্বাস পাওয়া যায়। ২২ আগস্ট তুষার ভাই জানান, তিনি দেশের বাইরে আছেন এবং সন্দীপন প্রকাশনীর রোকন উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। ২৩ আগস্ট রোকন উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও আশ্বাস দেন।
৩১ আগস্ট এবং ৩ সেপ্টেম্বর পুনরায় রোকন উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং দুইবারই আশ্বাস পাওয়া যায়। সর্বশেষ ৬ সেপ্টেম্বর তুষার ও রোকন উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানান, এখন বিষয়টি ফাউন্ডেশনের হাতে।
এরপরও যখন ৬ সেপ্টেম্বর আমাদের জানানো হয় যে এখন আর কিছু করার নেই এবং বিষয়টি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হাতে, তখন আমরা সরাসরি ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ বাকীর সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি বিষয়টি বিবেচনার জন্য লিখিতভাবে সুপারিশ করেন।
তাহলে প্রশ্নটি খুব স্বাভাবিক—আমরা যদি যোগাযোগই না করে থাকি, তাহলে ২৮ জুলাই থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কার সঙ্গে আমাদের এই ধারাবাহিক যোগাযোগ ও আলোচনা হয়েছে? এবং যদি বিষয়টি শুরু থেকেই দেওয়া সম্ভব না হতো, তাহলে এতদিন আমাদের আশ্বস্ত করা হলো কেন?
আমরা এই প্রশ্নগুলো কাউকে বিব্রত করার জন্য তুলছি না। বরং পুরো বিষয়টির প্রকৃত অবস্থান পরিষ্কার করার জন্যই তুলছি। কারণ লিটলম্যাগের তরুণদের পক্ষ থেকে যোগাযোগের ঘাটতি ছিল—এমন একটি ধারণা তৈরি হলে তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না।
৪. ফাউন্ডেশন ও প্রকাশকদের বক্তব্যে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে
বিষয়টি পরিষ্কার করতে আমরা ইসলামী ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালকের সম্মতিপত্রও সংগ্রহ করেছি। এরপর প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক রেজ্জাকুল হায়দারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, মেলা কমিটির প্রকাশক সদস্যদের একটি অংশ লিটলম্যাগ কর্নারের বিষয়ে ‘ক্লিয়ারেন্স’ দিতে সম্মত হয়নি এবং বিগত বছরের কিছু ঘটনাকে সামনে এনে আপত্তি জানিয়েছে।
অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট প্রকাশকদের সঙ্গে আমাদের যে যোগাযোগ হয়েছে, সেখানে আমরা কর্নার দেওয়ার আশ্বাস পেয়েছি। ফলে একদিকে আমাদের কাছে প্রকাশকদের পক্ষ থেকে আশ্বাস এসেছে, অন্যদিকে এখন বলা হচ্ছে বিষয়টি ফাউন্ডেশনের হাতে; আবার ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে প্রকাশকদের আপত্তির কথা বলা হচ্ছে।
আমরা কোনো পক্ষকে অভিযুক্ত করতে চাই না। কিন্তু এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানের মধ্যে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—লিটলম্যাগ আন্দোলনকে কি দুই পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের মধ্যবর্তী একটি ‘টুল’ হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে? কেন তরুণ প্রজন্মকে আন্দোলনের দিকে উস্কানি দেওয়া হচ্ছে?
আমরা আশা করি, এর পেছনে কোনো অদৃশ্য স্বার্থ বা উদ্দেশ্য নেই। থাকলে সেটিও স্বচ্ছভাবে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
৫. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিটলম্যাগ কর্নারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত তরুণেরা ধর্মবিরোধী ও নাস্তিক। যারা এই ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে, তারা ধর্মীয় ও মতাদর্শিক অসহিষ্ণু। দুঃখজনকভাবে তারা প্রকাশকদের লিটলম্যাগ কর্নার না রাখার ব্যাপারে উস্কানি দিচ্ছে। এবং অনেকে এতে সাড়াও দিয়েছে। এর পেছনে গত বছরের একটি ঘটনাকে সামনে আনা হচ্ছে।
৬. লিটলম্যাগ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কারা?
লিটলম্যাগ কর্নারের সঙ্গে যুক্ত তরুণদের বড় একটি অংশ মূলধারার কওমি শিক্ষাব্যবস্থা থেকে উঠে আসা শিক্ষার্থী, লেখক, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মী। তারা ইসলামি সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমকালীন চিন্তাচর্চায় কাজ করছেন। তাদের চাওয়া খুব সাধারণ—ইসলামি বইমেলার ভেতরেই নিজেদের সাহিত্য ও চিন্তাচর্চার জন্য একটি পরিসর। আমরা মনে করি, নতুন প্রজন্মের এই উদ্যোগকে জায়গা দেওয়া ইসলামি বইমেলার পরিসরকেই সমৃদ্ধ করবে।
৭. গত বছরের ঘটনা
গত বছর লিটলম্যাগ কর্নারে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেখানে উপস্থিত কয়েকজনকে নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে লিটলম্যাগ আন্দোলনের কর্মীদের সঙ্গে আক্রমণাত্মক আচরণও করা হয়।
আমরা তখন বিষয়টিকে সংঘাতের দিকে না নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করেছি। মেলা কমিটির আহ্বায়ক মাহমুদুল ইসলাম তুষারের কাছেও দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছিল এবং তিনি আন্তরিকভাবে বলেছিলেন, ‘তোমরা তো আমাদের ছোট ভাই-ই।’
আমরা বিষয়টিকে সেখানেই সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে সমাপ্ত মনে করেছিলাম। তাই এখন সেই ঘটনাকে আবার সামনে এনে লিটলম্যাগ কর্নারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করা হলে তার প্রয়োজনীয়তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়।
৮. আমাদের দাবি
আমাদের দাবি মূলত তিনটি—
প্রথমত, গত বছরের ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘদিনের দাবির ভিত্তিতে এ বছর বিশেষ বিবেচনায় ইসলামি বইমেলায় লিটলম্যাগ কর্নার বরাদ্দ দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, লিটলম্যাগ কর্নারকে সাধারণ বাণিজ্যিক স্টল হিসেবে বিবেচনা না করে বইমেলার সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক আয়োজনের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
তৃতীয়ত, লিটলম্যাগ কর্নার নিয়ে যদি কোনো প্রশাসনিক বা নীতিগত আপত্তি থাকে, তাহলে তার সুনির্দিষ্ট কারণ আমাদের লিখিতভাবে জানাতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য সমন্বয় করে একটি স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত দিতে হবে।
আমরা কারও বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে চাই না। ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং মেলা কমিটির প্রকাশকদের সঙ্গে আমাদের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে এবং আমরা তা বজায় রাখতে চাই। আমরা শুধু চাই—এই বিষয়টি যেন কোনো পক্ষের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ বা ভিন্ন কোনো স্বার্থের অংশ না হয়। তরুণ লেখক, সম্পাদক ও সংস্কৃতিকর্মীদের একটি উদ্যোগকে যেন কারও অবস্থান প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা না হয়।
লিটলম্যাগ কর্নার দেওয়া হলে কারও ক্ষতি হবে না। বরং ইসলামি বইমেলায় সাহিত্য, চিন্তা ও সৃজনশীলতার পরিসর আরও বিস্তৃত হবে। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করে দ্রুত একটি ন্যায়সংগত ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত নেবে।
ধন্যবাদ।



