চামড়া কালেকশন: সমস্যা, সিদ্ধান্ত ও সম্ভাবনা

  – মুফতি আবুল বাশার। শিক্ষক, জামিয়া বাবুস সালাম বিমানবন্দর ঢাকা।

পূর্ব কথা:

বহু বছর যাবৎ হাজার হাজার কওমি মাদ্রাসার লাখ লাখ ছাত্র কোরবানির মৌসুমে চামড়া কালেকশন করে আসছে। এতে যেমনিভাবে এতিম ছাত্রদের ভরণপোষণের খরচের যোগান হচ্ছে, তেমনি ভাবে কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী ও ট্যানারি মালিকদের লাভেরও বহু দিক রয়েছে। কিন্তু এ বছর যুক্তিসঙ্গত বেশ কিছু কারণে সিলেটের ‘কওমি মাদ্রাসা সংরক্ষণ পরিষদ’ ও ঢাকার বড় বড় কিছু মাদ্রাসা কোরবানির পশুর চামড়া কালেকশন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই প্রবন্ধে আলোচনা হবে কওমী ছাত্রদের চামড়া কালেকশনের এই প্রথা কেন কিভাবে শুরু হলো?
এখন তা বন্ধের সিদ্ধান্ত কেন? এই সিদ্ধান্তের ফলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কি কি প্রভাব পড়তে পারে? চামড়া সংক্রান্ত অন্যান্য জটিলতা এড়াতে আমরা কি কি পদক্ষেপ নিতে পারি? এমন যুগান্তকারী কোন সিদ্ধান্ত বা সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব কিনা যা চামড়া সিন্ডিকেট কে চ্যালেঞ্জ করে পরিবর্তন করে দিতে পারে কওমি মাদ্রাসার ভাগ্য এবং খুলে দিতে পারে সম্ভাবনার দুয়ার?

এক:
কওমী ছাত্রদের চামড়া কালেকশনের এই প্রথা কেন কিভাবে শুরু হলো?

মুঘল সাম্রাজ্য বা তারও আগে উপমহাদেশে ইসলামী শাসন চলা কালীন ইসলামী বিদ্যালয়গুলো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থায়নে চলত যেমন বর্তমানে স্কুল, কলেজগুলো সরকারি অর্থায়নে চলে। পরবর্তীতে ইংরেজদের শাসন আমলে তারা মুসলিমদেরকে তাদের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ও থ্রেড মনে করার কারণে এ সকল ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেমন মকতব, মাদরাসা, কুল্লিয়া ও জামেয়াগুলোর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করে দেয় এবং বিভিন্ন তালবাহানা ও অজুহাতে এগুলো বন্ধ করার পায়তারা চলায়। ফলে যখনই কোন আলেম ইহকাল ত্যাগ করতেন তার জায়গা পূরণের মতো অন্য কোন আলেম তৈরি হতো না এবং যখনই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কোন মাদরাসা বন্ধ হয়ে যেত তার পরিবর্তে অন্য কোন মাদ্রাসাও প্রতিষ্ঠিত হতো না। বিপরীতে জাগতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছিল। এমন সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে কতিপয় বিচক্ষণ উলামায়ে কেরাম উপমহাদেশে ইসলামের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তারা সিদ্ধান্ত নেন রাষ্ট্রীয় কোন পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই আল্লাহর উপর ভরসা এবং ধর্মপ্রাণ মানুষের সহযোগিতায় ইসলামের শিক্ষা-দীক্ষার এই মহান ও অত্যাবশ্যকীয় কাজ চালিয়ে যাবেন। তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় দারুল উলুম দেওবন্দ। শুরু হয় জনসাধারণের আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করার প্রথা। প্রতিষ্ঠিত হয় লিল্লাহ বোর্ডিং বা ঘুরাবা ফান্ড। কোরবানির পশুর চামড়া কালেকশনের এই রেওয়াজ তারই এক অংশ।

কে বা কারা কবে থেকে তা শুরু করে এই ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া যায় না তবে কিছু কারণ ও যৌক্তিকতা রয়েছে যার ফলে ইসলামপ্রিয় মানুষ ও মাদ্রাসার মধ্যে কোরবানির পশুর চামড়া লেনদেনের এই সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

[এক]
যেহেতু কোরবানির পশুর চামড়া সাদকা করাটাই অধিক সহজ ও পছন্দনীয়। আর মাদ্রাসার ছাত্ররাই বেশ কয়েকটি কারণে এ সদকার অধিক হকদার। ১-তাদের অনেকেই প্রকৃতপক্ষে আর্থিক ভাবে অসচ্ছল। ২-দ্বীন ও ধর্মের জন্য নিবেদিত প্রাণ।
৩-তুলনামূলক অন্যদের চেয়ে ভালো ও নেককার।

[দুই]
মাদ্রাসায় দান করলে তা সদকায়ে জারিয়া হয়ে থাকে।

[তিন]
মাদ্রাসা গুলো যেহেতু রাষ্ট্রের অসচ্ছল, অসহায় ও এতিম সন্তানদের দায়িত্ব নিচ্ছে যা মূলত রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব ছিল তাই এদের কে সাহায্য- সহযোগিতা করা রাষ্ট্রীয় বসবাসরত প্রত্যেক নাগরিকের রাষ্ট্রীয় কর্তব্য।

[চার]
মাদ্রাসাগুলো যেহেতু রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে না বা নিচ্ছে না তাই তাদেরকে আর্থিক সহযোগিতা করা অন্যদের তুলনায় অধিক যুক্তিযুক্ত ও ফলপ্রসূ।

[পাঁচ]
মাদ্রাসায় টাকা পয়সা ও অর্থ সম্পদের সঠিক ব্যবহার করা হয়। আমানত রক্ষা করা হয়। তাই জনসাধারণ তাদের সদকা আদায় নিয়ে কোন টেনশন করতে হয় না।

এভাবে চামড়া দাতা ও গ্রহীতা উভয়ই লাভবান হয়। দাতা পক্ষ কষ্ট ছাড়া উপযুক্ত স্থানে খুবসহজেই চামড়া পৌঁছে দিয়ে নিশ্চিত হয়। আর মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ পুরো বছর বা বছরের অধিকাংশ সময়ের বোর্ডিং খরচ এই চামড়া দ্বারা আয় করে নেয়।

দুই:
বহু বছর যাবৎ চামড়া কালেকশনের প্রথা থাকা সত্ত্বেও কেন কিছু মাদ্রাসা এ বছর কোরবানির পশুর চামড়া কালেকশন না করার সিদ্ধান্ত নিল?

কওমি মাদ্রাসায় কোরবানির পশুর চামড়া কালেকশনকে কেন্দ্র করে উদযাপিত হতো বহু অনুষ্ঠান, সংগঠিত হতো অনেক আয়োজন ও সেমিনার। এক সপ্তাহ আগে থেকে শুরু হতো প্লান প্রোগ্রাম ও কাজের দৌড়ঝাঁপ। দূর দূরান্ত পর্যন্ত বাসায় বাসায় যেয়ে চিঠি বিলি করা, গভীর রাতে রাস্তার অলিতে গলিতে হেঁটে হেঁটে লিল্লাহ বোর্ডিং এর পোস্টার লাগানো, পশু জবাইয়ের জন্য ছুরি ধার দেওয়া, মাসালা অনুযায়ী পশু জবাই করা ও করনীয়-বর্জনীয় ইত্যাদি বিষয়ের প্র্যাকটিক্যাল প্রশিক্ষণ, প্রায় প্রতিদিনদিন রাতে ছাত্রদের উৎফুল্ল রাখার জন্য বিভিন্ন কৌতুক অনুষ্ঠান করা এবং সর্বশেষ ঈদের দিন ভোর থেকে নিয়ে দীর্ঘ রাত পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম এসবই কওমি ছাত্রদের প্রতি কোরবানির কার্যক্রম। রক্তে ভেজা জামা, ক্লান্ত শরীর আর ক্ষুধার্ত পেট তবুও কারো কাজে নেই কোন অলসতা, মুখে নেই কোন আপত্তি, মনে নেই কোন ঘৃণা। সবার চেহারায় এক ঐশ্বরিক আনন্দের ছাপ। ছাত্র-ওস্তাদ, ছোট-বড় সবার জন্য কোরবানির চামড়ার কালেকশন একটি স্মৃতিময় অধ্যায়। তবে ইদানিং ঠিক কী কারনে চামড়া কালেকশন না করার সিদ্ধান্ত নিল বড় বড় প্রতিষ্ঠান?

মৌলিকভাবে এর জন্য তিনটি কারণ বিদ্যমান:

[এক]
ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেটের বেড়াজালে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে অস্বাভাবিক মাত্রায় চামড়ার দরপতন।

ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ জামিয়াতে ইব্রাহিম এবারের কোরবানিতে চামড়া কালেকশন না করার ব্যাপারে তাদের ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজে কারণ উল্লেখ করে বলে,
প্রতিবছর চামড়া সংগ্রহের জন্য ছাত্র-শিক্ষক মিলিয়ে প্রায় ৪০০ জন স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে থাকেন। সাধারণত প্রতিবছর চামড়া সংগ্রহ হতো ৫০০ থেকে ৬০০ এর মতো। তাছাড়া ঈদের আগে তিন দিন চারশো মানুষের মাদরাসায় থাকা অবস্থায় খাওয়া-দাওয়া, ঈদের দিন দুই বেলা অন্তত একটি গরু সহ মানসম্মত খাবার, সারাদিনের ট্রাক-পিকআপ ভাড়া, নাস্তার খরচ, চামড়া সংগ্রহের জন্য ভ্যান ভাড়া, রিকশা ভাড়া ইত্যাদি সার্বিক ব্যয়ের পরে চামড়া কালেকশন থেকে অবশিষ্ট জামিয়ার আয় হিসেবে বাঁচতো এক থেকে দেড় লাখ টাকা। (যা অংকে খুবই সামান্য, মাদ্রাসার মাত্র দেড় থেকে দুই দিনের খরচের সমান।)
রাজধানীর জামিয়া আরাবিয়া নতুনবাগ মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ আরমান বলেন, ‘২০১৩ সাল থেকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার কওমি মাদ্রাসার এই আয়ের উৎস বন্ধ করতে পরিকল্পিতভাবে চামড়ার বাজারে দরপতন ঘটায়। ফলস্বরূপ, এক সময়ের ‘নগদ সোনা’ খ্যাত কুরবানির চামড়া শেষ পর্যন্ত মূল্যহীন পণ্যে পরিণত হয়। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চামড়া সংরক্ষণের জন্য মাদ্রাসায় কাঁচা লবণ সরবরাহ করলেও, মূল সিন্ডিকেট না ভাঙায় তা অযৌক্তিক ও অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। তিনি আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, গত বছর চামড়া বিক্রি করেও লবণ কেনার টাকা পর্যন্ত ওঠেনি।’
পরিসংখ্যান বলছে, গত এক দশকে কুরবানির চামড়ার মূল্য পতন দেশের অর্থনীতিতে একটি কালো অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। ২০১৩ সালেও যে গরুর চামড়া প্রতিটি ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকায় বিক্রি হতো, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে তা নেমে আসেছিল মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। অনেক স্থানে দাম না পেয়ে ক্ষুব্ধ মৌসুমি ব্যবসায়ী ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ চামড়া মাটির নিচে পুঁতে ফেলেছেন কিংবা নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছেন।

[দুই]
প্রচলিত চামড়া কালেকশন দ্বারা হুজুরদের আত্মমর্যাদা নষ্ট হয় এবং ওলামায়ে কেরামের ভাবমূর্তি চরমভাবে বিধ্বস্ত হয়!

এই বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য করে বহু আগ থেকেই বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের অনেক বড় বড় মাদ্রাসা চামড়া কারেকশন বন্ধ করে দিয়েছে। তন্মধ্যে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য মাদ্রাসাগুলো হলো, দারুল মা’রিফ, পটিয়া মাদ্রাসা, জামিয়াতুল উলুমুল ইসলামিয়া এবং মাদ্রাসাতুল মদিনাসহ প্রায় সকল মাদানীনেসাব মাদ্রাসা। “নবী-রাসূলদের উত্তরসূরীর জন্য এই ধরনের কাজ কতটা মানানসই” এ বিষয়ে ইদানিং বহু আলেমদের কথা ও বক্তব্য বিভিন্ন মাদ্রাসার চামড়া কালেকশন না করার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে উৎসাহ হিসেবে কাজ করেছে।

কোরবানির পশুর চামড়া কালেকশন সম্পর্কে যাত্রাবাড়ী বড় মাদ্রাসার মুহতামিম ও দাওয়াতুল হকের কর্ণধার মুফতিমাহমুদুলহাসান সাহেব বলেন:
«যারা কাজ করবে, তারা শুধু কুরবানি করে চলে আসবে। চামড়া টানাটানি করা তাদের কাজ নয়। যারা মাদরাসায় দিতে চায়,তারা নিজ দায়িত্বে মাদরাসায় পৌঁছে দিয়ে যাবে।
শায়েখ বলেন- আমার উস্তাদ ইউসুফ বিন্নুরি রহ. চামড়া কালেকশন পছন্দ করতেন না। একবার কোনো কারণে তিনি অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ঈদের দিন যখন দেখলেন, ছাত্ররা কাঁধে করে রক্ত- ময়লাযুক্ত চামড়া বহন করে আনছে, সঙ্গে-সঙ্গে মাদরাসায় এসে বললেন ❝আভী বন্দ করো। ইয়ে তালাবা ওয়ারাসায়ে আম্বিয়া হ্যাঁয়। উন সে ইয়ে গান্দেগি কা কাম লেনা মুনাসিব নেহিঁ ❞। [এখনই বন্ধ কর। ছাত্ররা নবীর ওয়ারিস, তাদেরকে দিয়ে এ ময়লা চামড়া বহন করানো উচিত নয়।]»

বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস মরহুম আব্দুল হালিম বুখারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন:
«আমি চামড়া কালেকশন বন্ধ করে দিয়েছি। কারণ এক পাশে একজন কসাই চামড়া টানাটানি করবে আরেক পাশে মাদ্রাসার একজন মুহাদ্দিস চামড়া টানাটানি করবেন, মালিকের সাথে দর কষাকষি করবেন এটা একজন মুহাদ্দিসের শানের খেলাফ মনে করছি।»

এ ব্যাপারে শায়খুল হাদীস, শায়খ আবুল বাশার মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম হাফি. বলেন:
«বর্তমানে মাদরাসাগুলো জনগণের সাহায্য সহযোগিতায় চলার যে পদ্ধতিটা দেখা যাচ্ছে এটা মূলত আমাদের আকাবিরদের তরীকার বিপরীত। দেওবন্দে কালেকশনের জন্য আলাদা “মুহাসসিল” আছে। এটা উস্তাদ ছাত্রের কাজ নয়। আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে উস্তাদ ছাত্ররা এটা আঞ্জাম দেয়। কোরবানির সময় ছাত্রদের দিয়ে চামড়া কালেকশন করার বিষয়টা সব সময় আমাদের বিবেকে বাধে, আমাদেরকে পীড়া দেয়। একই বাড়ির সামনে ছাত্র-উস্তাদ দাঁড়িয়ে আছেন চামড়ার জন্য, ভিক্ষুক দাঁড়িয়ে আছে গোশতের জন্য। বাড়িওয়ালা ভিক্ষুকদেরও ধমকাচ্ছে, ছাত্র-শিক্ষকদেরও ধমকাচ্ছে। বাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়ার ঘটনাও তো আমাদের সামনেই ঘটেছে। এমন দৃশ্যগুলো আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। এছাড়াও আরও কত লাঞ্ছনাকর পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। তা তো আমরা নিজ চোখেই দেখেছি। আবার অল্প সময়ে ভালো পরিমাণ অর্থ আয় হওয়াতে কমিটির লোকেরা এটা কোনোভাবেই বন্ধ করতে সম্মত হয় না। তাছাড়া রমজান মাসে কালেকশনের জন্য শিক্ষকদের বাধ্য করাও আমাদের মাদরাসাগুলোতে বিচিত্র নয়। সে কালেকশন করতে গিয়ে তাদের মান-মর্যাদা ঠিক থাকবে কিনা তা দেখার যেন কেউ নেই।
হযরত থানবী রহ. এর বক্তব্য ছিল কোনো ছাত্র তো নয় কোনো শিক্ষকও কালেকশন করতে যাবে না। এমনকি যদি এর জন্য মাদরাসার সংখ্যা কমে যায়, তাও দীনের জন্য ভালো। তাই আমরা আমাদের এখানে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছি যেন ছাত্র-শিক্ষক সকলেরই ইজ্জত সুরক্ষিত থাকে। কালেকশনের জন্য তারা মানুষের বাড়ি-বাড়ি যাবে না। চামড়ার কালেকশন করবে না।»

[তিন]
ট্যানারি মালিকদের চামড়ার টাকা পরিশোধে তালবাহানা করা, এবং দীর্ঘসময় অতিক্রম হওয়ার পরও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাদের প্রাপ্য অধিকার বুঝে না পাওয়া। বহু জায়গায় দেখা গেছে মাদ্রাসার ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তি না থাকার কারণে নির্ধারিত স্বল্প মূল্যও তারা আদায় করতে সক্ষম হয়নি। এটাও বর্তমানে মাদ্রাসাগুলোর চামড়া কালেকশনে অনাগ্রহ প্রকাশের আরেকটি কারণ।

আরো ছোট ছোট কিছু কারণ বিদ্যমান রয়েছে। যেমন, কোরবানি উপলক্ষ্যে কোরবানির আগে ১০ দিন কাজে ব্যয় করতে হয় এবং যারা কষ্ট করে কালেকশন করেছে তাদের জন্য কোরবানির পরে ১০ থেকে ১৫ দিন বন্ধ দিতে হয় মোট ২৫ দিন সময় নষ্ট হয়ে যায়। যা ছাত্রদের পড়ালেখার জন্য খুবই ক্ষতিকর। আরেকটি কারণ হলো ঈদ ও আনন্দের এই বিশেষ ও আবেগঘন মুহূর্তটা সারা বছর আসেনা, সব সময় থাকে না। প্রত্যেকেই যেন এই বিশেষ মুহূর্ত টা যার যার আপনদের সাথে কাটাতে পারে সেই ব্যবস্থা করা। উল্লেখিত গুরুতর কারণগুলোর প্রতি লক্ষ রেখে চামড়া কালেকশন বন্ধের ব্যাপারে ঘোষণা দিচ্ছে বিভিন্ন মাদ্রাসা। নিশ্চয়ই তাদের এই সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক নয়।

তিন:
সমাজের শৃঙ্খলা ও সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে ছাত্রদের চামড়া কালেকশনের প্রভাব!

প্রতি বছর চামড়া কালেকশন কে কেন্দ্র করে কওমির সন্তানেরা দেশ ও জাতির জন্য স্বেচ্ছায় বহুবিধ সেবা দিয়ে আসছে। এটা এক দিকে যেমন জনমানুষের কল্যাণ ও পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যম তেমনি অপরদিকে স্বাবলম্বী সমাজ ও শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ার ফলপ্রসূ উপায়। সুতরাং ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট আর ক্ষমতাসীন দলের উদাসীনতার কারণে যদি মাদ্রাসার ছাত্ররা এই চামড়া কালেকশন বন্ধ করে দেয় তাহলে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক কি কি প্রভাব পড়তে পরতে পারে চলুন একটু দেখে নেওয়া যাক।

[এক]
গরু জবাই দেওয়ার জন্য রাস্তার মোড়ে মোড়ে অলিতে-গলিতে ধারালো ছুরি হাতে প্রস্তুত, নিয়ম-কানুন জানা, পারিশ্রমিক হীন দক্ষ জবাইকারী পাওয়া যাবেনা। কারণ কালেকশন না হলে ছাত্ররা যার যার গ্রামের বাড়ি চলে যাবেন এটাই স্বাভাবিক।

[দুই]
শহরের বহু জায়গায় কুরবানী করার জন্য হুজুর ভাড়া করে আনতে হতে পারে। কারণ কোরবানি একটি কাজ আর প্রতিটি কাজের ন্যায় এই কাজের জন্যও পারিশ্রমিক নেওয়া ও চুক্তি করা সম্পূর্ণই জায়েজ। তাই যেই ব্যক্তি তার নিজের সংসার পরিবার ও ঈদ থাকা সত্ত্বেও অন্যের কাজে আসবে তাকে কোনরকম পারিশ্রমিক ছাড়া ফিরিয়ে দিতে অবশ্যই বিবেকে বাঁধার কথা।

[তিন]
পর্যাপ্ত জবাইকরী না থাকার কারণে কোরবানির পশুর জবাই দিতে দিতে অনেক জায়গায় বিলম্ব হতে পারে। কোথাও কোথাও আসর, মাগরিব হয়ে যেতে পারে। ফলে মানুষের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত হবে।

[চার]
কোরবানি দাতারা সবচেয়ে বেশি ঝামেলায় পড়বে চামড়া নিয়ে। কারণ যদিও এই চামড়া সিদ্ধ করে খাওয়া যায় অথবা নিজে পরিশোধন করে ব্যবহার করা যায় কিন্তু এ দুটোই আমাদের সমাজে অপ্রচলিত এবং কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তাই সবাই চেষ্টা করবে উপযুক্ত কাউকে দান করে দিতে। এই কাজটাকেই মাদ্রাসার ছাত্ররা সহজ করে দিত। এখন যেহেতু তারা থাকবে না তাই কোরবানি দাতাকে হয়তো মাত্র একটি চামড়ার জন্য ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি করে টাকাটা আবার কোন উপযুক্ত মানুষ দেখে সদকা করে দিতে হবে। সারাদিন গরু জবাই নিয়ে ব্যস্ত থাকার পর ক্লান্ত শরীর নিয়ে মাত্র একটি চামড়ার জন্য এতদূর যাওয়াটা খুব একটা সহজ হবে বলে মনে হয় না।
[পাঁচ]
সারাদিনের ধকল সহ্য করার পর একটা মাত্র চামড়ার জন্য কে যাবে এত দূরে ট্যানারি মালিকের কাছে? এর ফলে বহু মানুষ হয়তো উপযুক্ত কাউকে না পেয়ে চামড়া কোথাও জমা না দিয়ে ফেলে দিতে পারে। যা দেশের চামড়া বাণিজ্যের জন্য আর্থিক ক্ষতি বয়ে আনতে পারে।
[ছয়]
ট্যানারি মালিকরাও কম বিপদে পড়বে না। সারা বছর যত চামড়া কালেকশন হয় তার ৬০ থেকে ৭০% এই কোরবানির মৌসুমী হয়ে থাকে। যার অধিকাংশটাই মাদ্রাসার হুজুরদের দ্বারা আনজাম দেওয়া হয়। হুজুররা না থাকলে ট্যানারির মালিকরা যদি তাদের পরিবর্তে সারা বাংলাদেশে চামড়া উঠানোর জন্য কর্মচারী নিয়োগ দেয় তাহলে ঈদের পুরা দিনের জন্য প্রতিজন কর্মচারীকে অন্তত দেড় থেকে দুই হাজার টাকা দিতে হবে। তাও আবার পর্যাপ্ত কর্মচারী না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তথাপি বাংলার ধর্মপ্রাণ মানুষ এ ধরনের প্যান্ট-শার্ট পরা, দাড়ি কামানো পেশাদার মানুষের হাতে তাদের কষ্টে অর্জিত হালাল ইনকামের টাকায় কিনা কোরবানির পশুর চামড়া অর্পণ করবে কিনা সেখানেও থেকে যায় অনেক অনেক সন্দেহ। এক কথায় বলা যায় ট্যানারি মালিকদের ক্ষতির সম্ভাবনা ৯৯.৯৯%
[সাত]
হুজুররা চামড়া না নিলে এর পরিবর্তে পাড়া-মহল্লায় ক্যাডার-মস্তানরা ক্ষুদ্র মূল্যে এই চামড়া ক্রয় করার জন্য অথবা বিনামূল্যে দান করার জন্য জনসাধারণকে বাধ্য করতে পারে। এটা দূরবর্তী কোনো ব্যাপার নয়। যেমনটা আমরা আওয়ামী সরকারের সময় অনেক জায়গায় দেখতে পেয়েছি।
[আট]
কিছু চক্র বেশি দামের জন্য বর্ডার দিয়ে কাঁচা চামড়া পাচার করতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে দেশের চামড়া বাণিজ্যের অর্থনীতি।
[নয়]
গোস্ত হাতে আসতে আসতে যদি আসর-মাগরিব হয়ে যায় তাহলে আরেকটা সমস্যা হবে, দরিদ্র, অসহায় ফকির মিসকিনদের হাতে গোস্ত পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেক রাত হয়ে যাবে বা কোন কোন জায়গায় পৌঁছানো সম্ভবই হবে না। ফলে ঈদের মতো খুশি ও আনন্দের দিনে সারা বছরের ন্যায় এই দিনেও তারা মন মত ভালো খাবারের সুযোগ পাবে না।
[দশ]
পশু জবাই দিয়ে খালাস করতে করতে যদি আসর মাগরিব হয়ে যায় তাহলে ঈদের দিনের অন্যান্য আনন্দ, বন্ধু বান্ধবের সাথে গল্প-গুজব ও ঘুরাঘুরির সম্ভাবনা অনেকাংশেই হারিয়ে যাবে।

মাত্র সিলেট জেলার মাদ্রাসা, জামিয়াতু ইব্রাহিম সাইনবোর্ড মাদ্রাসা ও জামিয়া রশিদীয়া বাঘাবাড়ী মাদ্রাসার মত অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানের এই সিদ্ধান্তেই নড়েচড়ে বসেছে সমগ্র প্রশাসন। এই সিদ্ধান্তের ব্যাপক ক্ষতি ও গুরুতর সমস্যার ব্যাপারে আঁচ করতে পেরেছে দেশের বুদ্ধিজীবী মহল। তাইতো পত্র-পত্রিকায় চামড়া কালেকশনের উপকারিতা ও ভালো দিক এবং না করার ক্ষতি সম্পর্কে বিভিন্ন লেখালেখি হচ্ছে। বলা হচ্ছে “বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়বে চামড়া বাণিজ্য”। কখনো আবার ন্যূনতম দাম বাড়িয়ে কাজে ফেরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ইসলামী ফাউন্ডেশন কর্তৃক “চামড়া কালেকশনে ওলামায়ে কেরামের দায়িত্ব” শিরোনামে আলোচনা সভা রাখা হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলছেন কিভাবে চামড়ায় বেশি দাম পাওয়া যায় আমরা সবাইকে সেই প্রশিক্ষণ দেব। প্রয়োজনে মাদ্রাসায় মাদ্রাসায় ফ্রিতে লবণ বিতরণ করব। তিনি বহুদিন যাবত চলে আসা এই সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য হুজুরদের কাছে কিছু সময়ের অনুরোধ করেছেন। তবে এরকম অনুরোধ ও আশ্বাস বহু বছর যাবৎ ওলামায়ে কেরাম দেখে আসছে। বাস্তবতা সময়ই বলে দিবে।

চার:
চামড়া সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে ও তার ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ ও আদায়ের ক্ষেত্রে আদায়ে আমাদের করণীয়!

আমি যতটুকু বুঝি; চামড়া কালেকশনের মূল উদ্দেশ্য হলো জনমানুষের সাথে সম্পর্ক করার পাশাপাশি সমৃদ্ধি অর্জন করা, অসহায় এতিম ছাত্রদের যাবতীয় প্রয়োজন পূরণে সক্ষম হওয়া। এটা যেমনিভাবে চামড়া কালেকশনের দ্বারা হয়ে থাকে তেমনিভাবে অন্য আরো যেকোনো ভাবেই হতে পারে। সুতরাং যদি কোন মাদ্রাসা তাদের এতিম ছাত্রদের অর্থের যোগান দেওয়ার জন্য চামড়া কালেকশন ছাড়া অন্য কোন সম্মানজনক পন্থা অবলম্বন করতে পারে তা অবশ্যই প্রশংসনীয় এবং সাধুবাদ যোগ্য। যেমন মাদ্রাসার কোন জায়গা বা বিল্ডিং ভাড়া দেওয়া ইত্যাদি। আমার জানামতে এমন বেশ কিছু মাদ্রাসা রয়েছে যাদের নিজেদের মার্কেট, দোকান, জায়গা ইত্যাদি আছে। তা থেকে প্রাপ্ত ভাড়া দিয়ে মাদরাসার যাবতীয় প্রয়োজন পুরা করা হয়। ইশ্! সে সকল মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের ভাগ্য কতইনা ভালো যাদের খাবার, বেতন, ভাতা সব কিছু মাদ্রাসার আয়ের উৎস থেকেই এসে থাকে। কোন প্রকার দান-দক্ষিণা, মানত-সদকা, যাকাত-ফিতরা বা সুদ-ঘুষের অর্থ সম্পদ তাদেরকে গ্রহণ করতে হয়না। সুতরাং এ ধরনের মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের চামড়া কালেকশন না করায় কোন সমস্যা বা ক্ষতি নেই।

অন্যদিকে যে সকল মাদ্রাসার নিজেদেরকে স্বনির্ভর করার মতো সাধ্য-সামর্থ্য আপাতত নেই বরং তারা চামড়া কালেকশন করেই চলতে চায়, তারা কিভাবে নিজেদের আত্মসম্মান বজায় রেখে কালেকশন করতে পারে ও চামড়ার ন্যায্য মূল্য পেতে পারে সেইদিকে অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে।

চামড়া কালেকশনে আত্মমর্যাদা বজায় রাখতে যা যা করতে পারি:

[এক]
মাদ্রাসা কেন্দ্রিক এরিয়া ভাগ করে নেওয়া। এক মাদ্রাসার এরিয়াতে অন্য মাদ্রাসার ছাত্ররা কালেকশনে না যাওয়া। এতে করে পরস্পরের মধ্যে কম্পিটিশন থাকবে না। ফলে চামড়া নিয়ে টানাটানি, দৌড়াদৌড়ি ও দরকষাকষির যে আপত্তিকর পরিস্থিতি ঘটে তা থেকে অনেকাংশেই বেঁচে থাকা সম্ভব হবে।

[দুই]
কোরবানির দিন আসার আগে আগে জুমার বয়ানে বা ছোট পরিসরে সেমিনার করে সেখানে মানুষকে এ কথা বুঝানোর চেষ্টা করা যে মাদ্রাসার ছাত্ররা আপনার চামড়ার অধিক হকদার। এর দ্বারা আপনি তাদের উপর কোন অনুগ্রহ করছেন না। বরং আপনার দায়িত্ব পালন করছেন। “ফরজে কিফায়া” ইলম প্রথমিকভাবে সবার উপরেই ফরজ। যদি কেউ তা আদায় না করে তাহলে সবাই গুনাগার হবে। আর সকলের পক্ষ থেকে একদল আদায় করে দিলে অন্যরা সবাই বেঁচে যাবে। তো মাদ্রাসার ছাত্ররা নিজেদের ঘাড়ে আপনাদের সেই ফরজে কেফায়ার দায়িত্বটুকু তুলে নিয়ে নিজেদের সময় ও শ্রম দিচ্ছে। এখন আপনাদের দায়িত্ব হল আপনার দায়িত্ব যে কাঁধে নিল তার খরচের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেওয়া। এভাবে বুঝিয়ে বুঝিয়ে মানুষের মন প্রস্তুত করা।

[তিন]
কালেকশনের এলাকায় অস্থায়ীভাবে বিশেষ বিশেষ পয়েন্টে ছোট ছোট ক্যাম্প স্থাপন করা। যেখানে এলাকাবাসীরা এসে মাদ্রাসার জন্য চামড়া জমা দিয়ে যাবে। ছাত্রদেরকে তাদের পিছে পিছে ঘুরতে হবে না। এমন হালত তৈরি করা।

এ ব্যাপারে আমিরে শরিয়ত হজরত মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ. বলেন- ‘মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও ছাত্ররা জাকাত-ফেতরার টাকা, খাস করে কোরবানির চামড়া সংগ্রহ করার জন্য শহরের অলিতে-গলিতে ঘোরাফেরা করে। এটা দ্বীনের জন্য বড়ই বেইজ্জতির কথা। এতে মাদরাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের প্রতি মানুষের হেয় দৃষ্টি তৈরি হয়, যা ধর্মের জন্য ক্ষতিকর।’ তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘মাদরাসা কর্তৃপক্ষের প্রতি বিশেষ অসিয়ত থাকল, তারা যেন ছাত্রদের এভাবে চামড়া সংগ্রহ করতে না পাঠায়। বরং মাদরাসা প্রাঙ্গণে ও শহরের বিভিন্ন জায়গায় ক্যাম্প থাকবে। সেখানে মাদ্রাসাদরদী জনগণ নিজেদের দায়িত্বে চামড়া পৌঁছাবেন। আল্লাহ পাকের ওপর ভরসা করে মাদরাসা চালান। হেয়তাপূর্ণ কাজ বন্ধ করুন।’ (আমিরে শরিয়ত মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ./লেখক: নাসীম আরাফাত, পৃষ্ঠা : ১৯)

ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ এবং তা আদায়ের লক্ষে কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ:

[এক]
ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত সমগ্র বাংলাদেশের সকল কওমি মাদ্রাসাগুলোর এই ঘোষণা দেওয়া যে আমরা কোরবানির কালেকশন করব না অথবা কালেকশন করে সেটা ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি করব না। এইবার অল্প কিছু মাদ্রাসার সাহসী পদক্ষেপেই সরকার নড়েচড়ে বসেছে। উপায়ান্তর না দেখে হাস্যকর পর্যায়ের হলেও মূল্যবৃদ্ধি করেছে। একবার ভাবুন তো সকল মাদ্রাসা যদি এমন পদক্ষেপ নিত তাহলে এর ফলাফলটা কতটা গভীর হতো!?

[দুই]
আমাদের দাবি থাকবে প্রতি বছর মুদ্রাস্ফীতি পার্সেন্ট হারে চামড়ার মূল্য বৃদ্ধি করতে হবে। যদি চামড়া দ্বারা তৈরিকৃত ব্যাগ, বেল্ট, ওয়ালেট, ক্যাপ, জুতা ইত্যাদি সবকিছুর মূল্য বৃদ্ধি পেতে পারে তাহলে চামড়ার মূল্য কেন বৃদ্ধি পাবে না? অবশ্যই এটা কোন অযৌক্তিক দাবি নয়। এই পরিমাণ মূল্য বৃদ্ধি করার জন্য যা করা দরকার আমাদের তাই করতে হবে।

[তিন]
এতকিছুর পরেও যদি ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ না হয় এবং এবং কালেকশন ছাড়া আমাদের আর অন্য কোন উপায় না থাকে তাহলে অন্তত এতোটুকু খেয়াল করা যে বর্তমান বাজারে চামড়ার যেই মূল্য চলছে আমার কোন ভুলের কারণে যেন এর দাম আরো কমে না যায়। এজন্য আমাদেরকে খেয়াল রাখতে হবে যে , সরকার প্রতি বর্গফুটে চামড়ার যেই দাম নির্ধারণ করেছে তথা ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এটা লবন দেওয়া চামড়ার মূল্য। আমাদেরকে অবশ্যই চামড়ায় লবণ দেয়ার চেষ্টা করতে হবে। অন্যথায় আড়ৎ মালিকরা আনুমানিকভাবে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মতো কমিয়ে রাখেন। বরং কোথাও কোথাও তো ২ হাজার টাকার পুরো চামড়াকেই মাত্র ৫০০-৭০০ টাকায় দামাদামি করেন।

চামড়ায় লবণ দিব যেভাবে:

কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ীরা জানান, চামড়ার হিসাব হয় বর্গফুটে। ৩৫ থেকে ৫০ বর্গফুটের চামড়াকে বড় আকারের ধরা হয়। এই আকারের একটি চামড়া সংরক্ষণের জন্য ৮ থেকে ৯ কেজি লবণ প্রয়োজন হয়। আর চামড়ার আকার ৫৫ থেকে ৬০ বর্গফুট হলে লবণ লাগে ১০ কেজির মতো।
আর মাঝারি (২০-২৫ বর্গফুট) আকারের একটি চামড়ার জন্য ৫ থেকে ৬ কেজি লবণ প্রয়োজন হয়। আর ছোট (১৫-১৬ বর্গফুট) আকারের চামড়ার জন্য লবণ লাগে ৩ থেকে ৪ কেজি। এ ছাড়া এক কেজি লবণ দিয়ে দুইয়ের বেশি ভেড়া, ছাগল বা খাসির চামড়া সংরক্ষণ করা যায়। চামড়ায় সাধারণত মোটা দানার লবণ যুক্ত করা হয়। চলতি বছর মোটা দানার লবণের দাম আগের বছরের তুলনায় কম। প্রতি কেজির দাম পড়ে ১৮ টাকার আশপাশে।
এই হিসাবে বড় আকারের, তথা ৩৫ থেকে ৫০ বর্গফুটের একেকটি চামড়ার জন্য ৮ থেকে ৯ কেজি বা ১৪৫ থেকে ১৬২ টাকার লবণ প্রয়োজন হবে।

লবণ যুক্ত করা হলে অনায়াসে সরকার নির্ধারিত দামেই চামড়া বিক্রি করা যাবে। অর্থাৎ আমি মাত্র ১৫০ টাকা খরচ করে ৫০০-১৫০০ টাকা সেভ করতে পারি।

চামড়ার ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করব কিভাবে?

গত ১৩ই মে বাণিজ্যমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন:
এ বছর লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ঢাকার মধ্যে প্রতিবর্গফুটে ৬২-৬৭ টাকা আর ঢাকার বাইরে ৫৭-৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের চেয়ে প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা বেড়েছে।

ছোট্ট একটা জরিপ করে দেখা যাযক এই সামান্য মূল্যবৃদ্ধি কি ন্যায্য মূল্যের জন্য যথেষ্ট ?

একটি মধ্যম ধরনের গরুর গায়ে সাধারণত ২০ থেকে ৩০ বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়।
সুতরাং সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী মধ্যম ধরনের একটি চামড়ার সর্বোচ্চ দাম হচ্ছে ৩০×৬৫= ১৯৫০ টাকা। সরকারের এই দাম কাঁচা চামড়ার জন্য নয় বরং লবণ দেওয়া চামড়ার জন্য। আরৎদারদের হিসাব মতে প্রতিটি চামড়ায় লবণ যুক্ত করতে সার্বিক খরচ হয় ২৮০ থেকে ৩২০ টাকার মতো। সুতরাং বাকি রইল ১৯৫০-৩২০= ১৬৩০ টাকা।
আবার পশু জবাইয়ের ছুরি ধার দেওয়া, চারদিন মাদ্রাসায় থাকা-খাওয়া, কালেকশনের এলাকায় যাওয়ার জন্য গাড়ি ভাড়া, এলাকা থেকে চামড়া আনার জন্য ভ্যান ভাড়া, এবং এই চামড়া ট্যানারি পর্যন্ত পৌঁছে দিতে ট্রাক ভাড়া ইত্যাদি ব্যয় বাবদ যদি প্রতি পিস চামড়া ও তার পিছনে খাটনি করা ছাত্রের আনুমানিক খরচ সর্বনিম্ন ৫০০ টাকাও ধরি তাহলে সব শেষ বাকি রইল ১৬৩০-৫০০=১১৩০ টাকা।
এই ১১৩০ টাকাই চামড়ার প্রকৃত মূল্য।

আর এই সামান্য মূল্যটা তখনই পাওয়া যাবে যখন ট্যানারি মালিকরা সিন্ডিকেট না করবে। তাদের পরস্পরের মধ্যে চুক্তি করা থাকে যে আমরা এই দামের বেশিতে কোন চামড়া কিনবো না। ফলে নামে মাত্র ৪০০-৫০০ টাকা এর মত সামান্য দাম বলে মানুষকে ফিরিয়ে দেয়। আর বিক্রেতা কয়েক জায়গায় ঘুরে উপায়ান্তর না দেখে সেই কম দামেই তাদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। পরিসংখ্যান বলছে ২০১৩ সালেও যে গরুর চামড়া প্রতিটি ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকায় বিক্রি হতো, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ট্যানারি ইন্ডিকেটর তা নেমে আসেছিল মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়।

দা গ্লোবাল ইকোনমিক এর জরিপ মতে সাম্প্রতিক সরকারি অর্থনৈতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০১৩-২০২৬ সাল পর্যন্ত এই ১৩ বছরে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ৬–৮% এর মধ্যে ছিল। ফলে সামগ্রিকভাবে এই তেরো বছরে সাধারণ পণ্যের মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় প্রায় ৮০%–১৪০% পর্যন্ত। সেই হিসাবে ২০১৩ সালে ২০০০ টাকায় বিক্রি হওয়া একটি কাঁচা চামড়ার দাম হওয়া উচিত ছিল ২০০০+৮০/১৪০%= ৩৬০০ থেকে ৪৮০০ টাকা।
এবার আপনি হিসাব করে দেখুন কোথায় ১১৩০ টাকা কোথায় ৪৮০০ টাকা! এইভাবে করায় গন্ডায় হিসাব করে আমরা চামড়ার ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করতে পারি।

পাঁচ:
সামান্য ইনভেস্ট, কিছু সিদ্ধান্ত, কতক পদক্ষেপ হলে এই চামড়া কালেকশন খুলে দিতে পারে ভবিষ্যতের আত্মনির্ভর কওমি অঙ্গনের বহু সম্ভাবনার দুয়ার।

সর্বত্রই ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট চলছে। একে তো সরকারের নির্ধারিত মূল্য খুবই কম তার ওপর আবার এর চেয়েও অনেক কম মূল্যে একপ্রকার বাধ্য হয়েই ট্যানারি মালিকদের কাছে আমরা পশুর চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি। সেই সাথে কালেকশনের কারণে ওলামাসুলভ আত্মমর্যাদার বিসর্জন এবং কৈশরিক ঈদ আনন্দের কোরবানি তো আছেই। এমন আরো নানাবিধ সমস্যাকে সামনে রেখে যে সকল মাদ্রাসা কালেকশন না করার ঘোষণা দিয়েছেন তারা অবশ্যই সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তবে এটা যদি তাদের স্থায়ী সিদ্ধান্ত হয় তাহলে সিদ্ধান্তের গভীরতা নিয়ে আরেকটু বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন বোধ করছি।

আমরা চাইলে এই ময়দান ত্যাগ করে ভিন্ন ময়দানে হাত দিতে পারি কিন্তু আমাদেরকে মনে রাখতে হবে এর সবচেয়ে বড় হকদার আমরাই। বর্তমান সময়ে চামড়া কালেকশনের অঙ্গনে আমরা যেই অবস্থানে রয়েছি তা একদিনে তৈরি হয়নি। আমাদেরকে মানুষ যেভাবে ভরসা করে পশুর চামড়া তুলে দেয় এমন ভাবে অন্য কাউকে তুলে দিতে তারা প্রস্তুত নয়। যুগের পর যুগ জনতার প্রতি আমাদের বিনিময়হীন সেবা ও ন্যায়নিষ্ঠতার কারণে আমরা বর্তমান অবস্থানে আসতে পেরেছি। সুতরাং এত কষ্টে গড়া একটা অবস্থানকে দুই একটা ক্ষতির দিক দেখে ছেড়ে দেওয়া ভালো হবে বলে আপনি মনে করেন? আমাদের উচিত এমন কোন পন্থা খুঁজে বের করা যাতে সিন্ডিকেট ও মানহানির মত ক্ষতিকর দিকগুলো না থাকে এবং আমাদের অবস্থানও বজায় থাকে। আমাদের গায়ে যারা ষড়যন্ত্র ও ক্ষতির পাথর নিক্ষেপ করবে আমরা সেই পাথর কুড়িয়ে প্রাসাদ নির্মাণ করে ওদের দাঁত ভাঙা জবাব দিব ইনশাআল্লাহ। এর জন্য আমাদের প্রয়োজন সামান্য ইনভেস্ট, কিছু সিদ্ধান্ত ও কতক সাহসী পদক্ষেপ।

আমরা যে সকল সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারি:

[এক]
ট্যানারি মালিকদের ধর্ণা না ধরে নিজেরাই পশুর চামড়ার পরিশোধনাগার বা ট্যানারির মালিক হওয়া।
সিন্ডিকেটের বাইরে এসে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মাঝে ট্যানারি শিল্পের সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। আজকাল তো তরুণদের মাঝে নতুন করে উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস সঞ্চার হচ্ছে। ইচ্ছে করলে এটাকে এ খাতে কাজে লাগানো যেতে পারে। অনেক আগে আরজাবাদ মাদরাসা কেন্দ্রিক এই বিষয়টিকে সামনে রেখে একটি সমিতিও হয়েছিল, বড়দের তত্ত্বাবধানে। নির্দিষ্ট করে দিন-তারিখ মনে নেই। কিন্তু চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী কওমির অন্যান্য উদ্যোগের মতো এটারও এক পর্যায়ে অকাল মৃত্যু হয়। সুতরাং আমরা যদি ট্যানারি শিল্পকে নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে কাঁচা চামড়া কালেকশন করে ফিনিশ লেদার বানিয়ে বিক্রি করতে পারি তাহলে আমাদের লাভ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে এবং সমৃদ্ধি ও স্বনির্ভরতার পথে আমরা বহুধাপ এগিয়ে যাব।

ট্যানারি শিল্পী লাভের পরিমাণ অনেক অনেক বেশি। আসুন লাভের পরিমাণটা একটু বোঝার চেষ্টা করি। তার আগে আমাদেরকে ট্যানিং এর প্রক্রিয়া বুঝতে হবে। তা নিম্নরূপ।
কাঁচা লবণযুক্ত চামড়া → Soaking → Liming → Fleshing → Splitting → Deliming → Pickling → Tanning → Wet Blue → Shaving → Dyeing → Fatliquoring → Drying → Finishing → Finished Leather ।
এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় একটি চামড়ার পিছনে আনুমানিক খরচ হতে পারে, লবণ ও সংরক্ষণে ৮০–১৫০ টাকা। কেমিক্যাল ও প্রসেসিংয়ের জন্য ৪০০–৮০০ টাকা। শ্রম ও বিদ্যুৎ বাবদ ২০০–৪০০ টাকা। রং ও ফিনিশিংয়ে ২০০–৬০০ টাকা। মোট প্রায় ৯০০–২০০০+ টাকা। উচ্চমানের ফিনিশ লেদার বানাতে খরচ আরও বেশি হতে পারে।

সুতরাং ফিনিশ লেদার পর্যন্ত একটি চামড়ার পিছনে সম্পূর্ণ খরচ হল ১৫০০+২০০০= ৩৫০০ টাকা।
বাংলাদেশি বাজারে আনুমানিক সাধারণ মানের ফিনিশ লেদারের মূল্য, মাঝারি–ভালো মান: প্রায় ৩,০০০–৭,০০০ টাকা। প্রিমিয়াম/এক্সপোর্ট মান: প্রায় ৭,০০০–১৫,০০০+ টাকা।
আর আন্তর্জাতিক বাজারে গরুর ভালো ফিনিশ লেদারের মূল্য প্রতি বর্গফুটে প্রায় ১৫–২০+ ডলার পর্যন্ত যেতে পারে।
মধ্যম সাইজের গরুর চামড়া যদি ২৫ বর্গফুট হয়, প্রত্যেক বর্গফুট ২০ ডলার করে আর প্রতি ডলার যদি ১২০ টাকা হয় তাহলে একটি মাঝারি আকৃতির গরুর চামড়ার দাম দাঁড়ায় ২৫×২০= ৫০০×১২০= ৬০০০০ (ষাট হাজার) টাকা। আপনার কেনা ও ট্যানিং খরচ ৩৫০০ এবং আনুষাঙ্গিক খরচ আরো ৬৫০০ টাকা ধরলেও একটি চামড়ায় সর্বমোট খরচ ১০ হাজার টাকা। যদি ভালো কোয়ালিটির ট্যানিং করা গরুর চামড়া বিদেশে ইমপোর্ট করা যায় তাহলে প্রতি চামড়ায় ১০ হাজার টাকা খরচ ধরার পরেও ৫০ হাজার টাকা লাভ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এবার ভেবে দেখেন ট্যানারি মালিকদের কাছে কাঁচা চামড়া চামড়া প্রতি পিস ১০০০-১২০০ করে বিক্রি করবেন নাকি নিজেরা পরিশোধন করে দেশের বাজারে ৭-১৫+ হাজার আর বিদেশের বাজারে ৫০-৬০ হাজার টাকা বিক্রি করবেন?

[দুই]
গত ২রা মে বেফাক এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায় যে কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের জন্য তারা দক্ষতা উন্নয়ন বা স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প চালু করবে। সুতরাং বেফাক যদি তার প্রকল্প গুলোর মধ্য চামড়া শিল্প, ট্যানারি শিল্পকেও অন্তর্ভুক্ত করে আমাদের তরুণ উদীয়মান উদ্যোক্তাদেরকে ট্রেনিং দেয় তাহলে আশা করা যায় খুব শীঘ্রই এই ময়দানে আমরা নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে পারবো।

[তিন]
আমরা চাইলে আরো একধাপ আগাতে পারি। ফিনিশ লেদার বিক্রি না করে আমরাই এর দ্বারা চামড়া জাত পণ্য তৈরি করতে পারি। তাতে লাভ আরো দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে এই মার্কেটে কওমী পড়ুয়া বহু উদ্যোক্তা রয়েছেন। SKM তারই এক জলন্ত প্রমাণ।

[চার]
চামড়া থেকে হালাল জেলাটিন বের করার শিল্পকে আমাদের দেশে বিকশিত করার জন্য কী কী কাজ করা দরকার, তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। জেলাটিন, যা ওষুধ, কসমেটিকসহ অনেক পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে কাজে লাগে। বিশ্ব বাজারে হালাল জেলাটিনের খুব চাহিদা, যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের দেশে জেলাটিনের ব্যবহার এখনো আমদানি নির্ভর।

চলতি বছর সারাদেশে কোরবানির পশুর (গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া) মোট চাহিদা রয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। যদি মাদ্রাসা ওয়ালাদের নিজস্ব ট্যানারি থাকে, এবং চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনের জন্য নিজেরাই বিভিন্ন ব্র্যান্ড খুলে বসে এবং পূর্বে উল্লিখিত পদ্ধতিতে শুধু এই বছরের ১ লাখ ৬ হাজার ফিনিশ চামড়া বা চামড়াজাত পণ্য বিক্রি করে তাহলে কি সারা বাংলাদেশের কোন মাদ্রাসায় কোন এতিম ছাত্রের জন্য আর কারো কাছে হাত পাততে হবে? কারো কাছে ছোট হতে হবে? অনিচ্ছা সত্ত্বেও কোন অনুপযুক্ত-অকর্মার ভূয়সি প্রশংসা করতে হবে? কোন মূর্খ, বেনামাজি, সুদখোর, ঘুষখোর মাদ্রাসার কোন ছাত্র-শিক্ষকের উপর জোর গলায় কথা বলতে পারবে? পারবেনা।
আর তখনই ফিরে আসবে কওমি মাদ্রাসার পুরনো জৌলুস, আত্মমর্যাদার রওনক আর কার্যকরী জ্ঞানের সোনালী অতীত। ইনশাআল্লাহ। 

 

সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের ফলো করুন