ছাত্র/ছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি প্রদান রোধ, ইসলাহী কার্যক্রম জোরদার, ছাত্র/ছাত্রী-সুরক্ষা কমিটি কার্যকরকরণ ও মাদরাসাবিরোধী অপপ্রচার রোধকল্পে আল-হাইআতুল উলয়া কর্তৃক দেশের ছয়টি বোর্ড ও অধিভুক্ত মাদরাসাসমূহের প্রতি সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনা প্রদান
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কওমি মাদরাসায় ছাত্র নির্যাতন ও কতিপয় ব্যক্তির অনৈতিক কার্যকলাপ সংক্রান্ত কিছু সংবাদ ও অভিযোগ প্রচারিত হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও দুঃখজনক। এ বিষয়ে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ সুস্পষ্টভাবে জানাচ্ছে— কোনো ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে অপরাধ বা অনৈতিক কাজে জড়িত থাকলে তার সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করা এবং অপরাধীকে কোনোরূপ প্রশ্রয় না দেওয়াই আল-হাইআতুল উলয়ার অবস্থান। তবে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমগ্র কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা, লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং ব্যক্তির অপরাধের দায় মাদরাসা, বোর্ড কিংবা সামগ্রিক আলেম-উলামা ও ছাত্রসমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সংগত নয়।
এই প্রেক্ষাপটে গত ২৯ রবীউল আউওয়াল ১৪৪৮ হিজরী / ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঈসাব্দ অনুষ্ঠিত আল-হাইআতুল উলয়ার স্থায়ী কমিটির ৬৯তম সভা এবং ইতঃপূর্বে ১৪ সফর ১৪৪৮ হিজরী / ২৯ জুলাই ২০২৬ ঈসাব্দ অনুষ্ঠিত সংশ্লিষ্ট সাবকমিটির সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে; হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.), শায়খুল হাদীস হযরত মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া কান্ধলভী (রহ.) ও উলামায়ে দেওবন্দের তা‘লীম-তারবিয়ত সংক্রান্ত রচনাবলি এবং প্রসিদ্ধ দীনি প্রতিষ্ঠানসমূহের ফতোয়ার অনুসরণে; আল-হাইআতুল উলয়া দেশের ছয়টি বোর্ডের অধিভুক্ত সকল ছাত্র ও ছাত্রী মাদরাসার উদ্দেশ্যে নিম্নরূপ দিক-নির্দেশনা জারি করেছে—
১. শাসনের শরয়ী সীমা নির্ধারণ
শাসনের একমাত্র উদ্দেশ্য হবে শিক্ষার্থীর সংশোধন ও কল্যাণ, প্রতিশোধ নয়। রাগের অবস্থায় কাউকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। শাসনের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে হবে— প্রথমে নম্র সতর্কতা, প্রয়োজনে মৃদু ভর্ৎসনা, এরপর রাগ-ধমক; একান্ত অপরিহার্য হলে সর্বশেষ ধাপ হিসেবে অভিভাবককে ডেকে লিখিতভাবে অবহিত করে অভিভাবকসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে— কোনো অবস্থাতেই ছাত্র/ছাত্রীকে শাস্তিস্বরূপ প্রহার করা যাবে না, যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। লাঠি, বেত বা কোনো যন্ত্র দিয়ে আঘাত করা, মুখমণ্ডল-মাথা বা স্পর্শকাতর অঙ্গে আঘাত করা এবং হাড় ভাঙা, রক্তপাত বা দাগ সৃষ্টিকারী যেকোনো শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রকাশ্যে অপমান, গালমন্দ, তিরস্কার, কটু ভাষা বা ঘৃণাসূচক সম্বোধন এবং অন্য যেকোনো মানসিক নির্যাতনমূলক আচরণও পরিহারযোগ্য বলে জানানো হয়েছে। এ সীমা লঙ্ঘনকারী শিক্ষক/শিক্ষিকা শরীয়ত ও বিধি উভয় দৃষ্টিতে জবাবদিহিতার আওতাভুক্ত থাকবেন।
২. ইসলাহী কার্যক্রম জোরদারকরণ
প্রতিটি মাদরাসায় শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত ইসলাহী মজলিস, নবনিযুক্ত শিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক তারবিয়াতি মজলিস এবং অভিভাবক-সমাবেশ আয়োজনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে সমস্যা দ্রুত মাদরাসা কর্তৃপক্ষের গোচরে আসে।
৩. ছাত্র/ছাত্রী-সুরক্ষা কমিটি অনতিবিলম্বে কার্যকরকরণ
প্রতিটি মাদরাসায় ‘সুরক্ষা কমিটি’ গঠন বা পুনর্গঠন করে তা সক্রিয় রাখতে হবে। যেকোনো অভিযোগ অবশ্যই কমিটির নিকট পেশ করার সুযোগ থাকতে হবে এবং ৭ দিনের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন পেশ করতে হবে। কমিটি না থাকা বা নিষ্ক্রিয় থাকা প্রমাণিত হলে তা ইলহাক স্থগিত বা বাতিলের কারণ হতে পারে।
৪. মাদরাসাবিরোধী অপপ্রচার রোধে করণীয়
প্রতিটি বোর্ডে পৃথক ‘মাদরাসা মনিটরিং সেল’ গঠন, বোর্ডভিত্তিক পৃথক হটলাইন চালু, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে সতর্কতা, অভিযোগ পাওয়ামাত্র তাৎক্ষণিক নিরপেক্ষ তদন্ত এবং মিথ্যা অপবাদ ও মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার নিরপরাধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আইনগত প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আল-হাইআতুল উলয়ার কেন্দ্রীয় হটলাইন নম্বর 01700-763178 (হোয়াটসঅ্যাপ)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে।
আল-হাইআতুল উলয়া দেশের সকল কওমি মাদরাসা, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও অভিভাবকদের প্রতি উপর্যুক্ত নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণের জন্য আহ্বান জানাচ্ছে।



