জুলাইয়ের বুকে লেখা ইতিহাস

জুলাই-১

যে দৃশ্যগুলো আজও ভুলতে পারিনি

আমি একজন কওমি মাদরাসার ছাত্র। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আমি যাত্রাবাড়ীর বড় মাদরাসায় দাওরায়ে হাদিসের ছাত্র ছিলাম। এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই দিনগুলোর স্মৃতি আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিছু স্মৃতি মানুষ কোনোদিন ভুলতে পারে না—জুলাই আমার জীবনে তেমনই এক স্মৃতি।
সম্ভবত ২ আগস্ট, শুক্রবার। আজও সেই দিনের একটি মুহূর্ত আমার হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে। চারদিকে অস্থিরতা, ভয় আর সংঘর্ষের মাঝেও হঠাৎ একটি মসজিদের মিনার থেকে ভেসে এলো এক আকুল আহ্বান।
“আল্লাহর ওয়াস্তে, এই যুদ্ধ বন্ধ করুন। মানুষকে অন্তত নামাজ আদায় করার সুযোগ করে দিন।”
সেই কণ্ঠে ছিল অসহায়ত্ব, ছিল শান্তির আকুতি। মনে হয়েছিল, হয়তো এবার সব থেমে যাবে। হয়তো মানুষ আল্লাহর ঘরের সম্মান রক্ষা করবে। কিন্তু আমার স্মৃতিতে, সেই আহ্বানের পরও পরিস্থিতি থামেনি। চারদিকে তখনও উত্তেজনা, আতঙ্ক আর সংঘর্ষ চলছিল।
আজও যখন সেই মিনারের কণ্ঠস্বর মনে পড়ে, বুকটা ভারী হয়ে আসে। মনে হয়, একজন মানুষ শেষবারের মতো মানবতা ও শান্তির আবেদন জানাচ্ছিলেন। সেই আহ্বান, সেই অসহায় কণ্ঠ আজও আমার হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয়।

প্রথম দিকে আমরা সরাসরি রাজপথে নামিনি। আমাদের কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থও ছিল না। আমরা বিভিন্নভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায়, যখন আমার এক সহপাঠী গুলিবিদ্ধ হয়। নিজের একজনকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখার পর আর নীরব থাকতে পারিনি। মনে হয়েছিল, অন্যায়ের সময় শুধু দর্শক হয়ে থাকা যায় না।

৩৬ জুলাই, যোহরের নামাজ পড়ছিলাম জায়েরা মসজিদে। নামাজের মধ্যেই বাইরে থেকে চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ ভেসে এলো। সালাম ফিরিয়ে দেখি, এক মাদরাসার ছাত্র রক্তমাখা পাঞ্জাবি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে বলছে, “আর বসে থাকার সময় নেই।” সেই দৃশ্য আজও আমার চোখে ভাসে।

আমরা একসঙ্গে রাজপথে নেমে গণভবনের দিকে রওনা দিলাম। বঙ্গভবনের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় শুনতে পেলাম—স্বৈরশাসক দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। সেই মুহূর্তের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আনন্দ, বিস্ময়, স্বস্তি—সব মিলিয়ে চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল, দীর্ঘ সংগ্রামের এক নতুন অধ্যায় শুরু হলো।

ফিরে আসার পথে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি দেখি। মানুষের ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছিল। এরপর চারদিকে গোলাগুলির শব্দ, মানুষের ছুটোছুটি, আহতদের আর্তনাদ—সব মিলিয়ে এক বিভীষিকাময় পরিবেশ। সেই সময় পরিচিত-অপরিচিত অনেক মানুষকে আহত হতে দেখেছি, অনেককে আর ফিরে আসতে দেখিনি।

আজও মনে পড়ে যাত্রাবাড়ী মাদরাসার ভেতরে ২০ টাকায় হালিম বিক্রি করা সেই প্রায় ১৪ বছরের কিশোরটির কথা। পরে জানতে পারি, তাকে ফ্লাইওভারের ওপর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। তার নিষ্পাপ মুখটি আজও আমার স্মৃতিতে ভাসে।

মাদরাসায় ফিরে যখন সারি সারি মরদেহ দেখেছিলাম, তখন অনেকের মুখমণ্ডল এতটাই বিকৃত হয়ে গিয়েছিল যে তাঁদের চেনা কঠিন হয়ে পড়েছিল। সেই দৃশ্য আজও আমাকে নাড়া দেয়। চোখ বন্ধ করলেও যেন সবকিছু আবার দেখতে পাই।

এই আন্দোলনে আমাদের কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ ছিল না। আমরা মনে করেছি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত বিজয় দান করেছেন। এই জন্য আমরা মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি।

“লং মার্চ টু ঢাকা, কাল নয়—আজ।”
এই একটি ঘোষণাই সেদিন অসংখ্য মানুষের মনে নতুন সাহস আর দৃঢ়তা এনে দিয়েছিল। অপেক্ষার সময় শেষ—এবার সিদ্ধান্তের সময়। মনে হয়েছিল, ইতিহাস আর একদিন অপেক্ষা করবে না; সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তই সবচেয়ে বড় শক্তি।
আল্লাহ তাআলার অশেষ অনুগ্রহে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবে রূপ নিয়েছিল। আজও সেই ঘোষণা কানে বাজে, আর মনে করিয়ে দেয়—কখনো কখনো একটি সঠিক সিদ্ধান্তই ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

আজও যখন জুলাই আসে, বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ব্যথা অনুভব করি। যারা সেই দিনগুলোতে প্রাণ হারিয়েছেন, আল্লাহ তাআলা তাঁদের প্রতি অশেষ রহম করুন, তাঁদের পরিবারকে ধৈর্য দান করুন এবং আহতদের পূর্ণ সুস্থতা দান করুন। আর আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে শান্তি, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তায় ভরে দিন।

আমীন।

সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের ফলো করুন