শ্রাবণ মাসের দুপুরের আকাশটা মেঘে মেঘে থমথমে হয়েছিল, কিন্তু রাজপথের উত্তাপের কাছে সেই মেঘের শীতলতা হেরে গিয়েছিল। রাফিদ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে স্নিকার্সের ফিতা বাঁধছিল। রক্তে তার এক ধরনের চঞ্চলতা, যা গত কয়েক সপ্তাহে এই শহরের হাজারো তরুণের ভেতরে দেখা গেছে।
মা পেছনে দাঁড়িয়েছিলেন। পরনে সাধারণ সুতির শাড়ি, মুখটা উদ্বেগে ফ্যাকাশে। রান্নাঘর থেকে আসা তেলের গন্ধ আর ঘরের নীরবতা যেন ভারী হয়ে উঠছিল।
“আজ আর বের না হলে হয় না, বাবা? চারদিকের পরিস্থিতি ভালো না,” মায়ের কণ্ঠে কোনো আদেশ ছিল না, ছিল শুধুই একজন মায়ের চিরন্তন আকুতি।
রাফিদ মায়ের দিকে তাকাল। তার ব্যাগে রাখা এক বোতল পানি আর কিছু ব্যান্ডেজ। বন্ধুদের বার্তা আগেই এসেছে—সবাই টিএসসির দিকে জড়ো হচ্ছে। রাফিদ মায়ের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, “মা, আজ যদি না যাই, তবে কাল আর কোনোদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না। তুমি দোয়া করো।”
মা আর কিছু বললেন না। শুধু হাতটা বাড়িয়ে ছেলের কপালে একটু ছুঁইয়ে দিলেন। রাফিদ বাসা থেকে বের হয়ে একছুটে নেমে গেল রাজপথে।
রাস্তায় নেমে এসে সে দেখল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। সেখানে কেবল তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা নয়, রয়েছে স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়ে, রিকশাচালক, পাশের গলি থেকে আসা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। কোনো ভয় নেই কারও চোখে, শুধু একটিই দাবি—অধিকার আর সত্যের জয়। পোস্টার উঁচিয়ে ধরা হাতগুলোর মধ্যে যেন পুরো দেশের ভবিষ্যৎ আঁকা হচ্ছিল।
হঠাৎ চারপাশ কোলাহলে ছেয়ে গেল। বিকট শব্দ, টিয়ার গ্যাসের ঝাঁজালো ধোঁয়া আর শোরগোল। মানুষ এদিক-ওদিক ছুটতে শুরু করল। রাফিদ ধোঁয়ার মধ্যে চোখ ঝাপসা হয়ে আসতে দেখল, কিন্তু দৌড়ে পেছনে পা বাড়াল না। তার পাশে থাকা ছোট একটা ছেলে টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়ায় কাশছিল, রাফিদ এগিয়ে গিয়ে তাকে আড়াল করে পানির বোতল এগিয়ে দিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে রাজপথের এক কোণে এক বৃদ্ধ রিকশাচালককে সে দেখল, যিনি রাস্তায় পড়ে থাকা একটি জাতীয় পতাকা তুলে সযত্নে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরছেন। চারপাশে স্লোগানের আওয়াজ আরও তীব্র হয়ে উঠল। হাজার হাজার কন্ঠ একসাথে মিশে এক নতুন ভোরের ডাক দিচ্ছে। ভয়ের দেয়ালগুলো ততক্ষণে ভেঙে খানখান হয়ে গেছে।
সন্ধ্যা নামার মুখে যখন আকাশে রক্তিম আলো ছড়ালো, রাফিদ বাড়ি ফিরল। তার জামায় ধুলোবালি, চোখে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু মুখের কোণে এক অদ্ভুত মুক্তির হাসি।
দরজা খুলতেই মা তাকে জড়িয়ে ধরলেন। রাফিদ মায়ের কানে কানে বলল, “মা, অন্ধকার কেটে যাচ্ছে। রাজপথ আজ আর ভয় পায় না।”
মা ছেলের মুখে হাত রেখে বাইরের লাল হয়ে আসা আকাশের দিকে তাকালেন। সেখানে এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার সূর্য উঠছিল।



