মানুষ একটি সামাজিক প্রাণী। তার বসবাস একটি সমাজকে ঘিরে। সমাজ পরিত্যাগ করে কারও পক্ষে চলা প্রায় অসম্ভব। কারও নিত্য চলাফেরা গ্রামীণ সমাজে আর কেউ শহুরে জীবনে অভ্যস্ত। পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ, হৃদ্যতা ও সহানুভূতি, একটি সুস্থ সমাজের জন্যে অতীব প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের পরিচিত সমাজে, আমাদের আচরিত পরিবেশে পরস্পরের অসংহতি, মনোমালিন্য ও অদৃশ্য দূরত্বের প্রবণতাটা খুবই জোরাল। একটি মুসলিম সমাজের স্ট্রাকচার বা ইমেজ যে চরিত্রে থাকার কথা; আমাদের সমাজ তার থেকে যোজন যোজন দূরে। একটি মুসলিম সমাজের সর্বোৎকৃষ্ট ও অনুসরণ-অপরিহার্য কাঠামো হলো—সাহাবায় কেরামের সমাজব্যবস্থা। তাঁরা সর্বক্ষেত্রে পরবর্তীদের আইডল, উত্তমাদর্শ। আমাদের সমাজকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করতে হবে তাঁদের সমাজকাঠামোর আদলে।
সাহাবীদের সমাজ অর্থাৎ একটি আদর্শ সমাজ ও আমাদের সমাজের পার্থক্যটা অসীম। তাঁদের পরস্পরের ভ্রাতৃত্ব ও আমাদের ভ্রাতৃত্বের গ্যাপ কোন কোন জায়গায় বা কী কী কারণে, তার উত্তর একজন সমাজচিন্তককে জিজ্ঞেস করলে হয়তো অনেক বয়ান হাজির হবে। কিন্তু মূল কথা হল—একটি সমাজের সংহতি ও ব্যবস্থাগত দিক সুন্দর হয়, যখন মানুষের মধ্যে পরস্পরে ভ্রাতৃত্বপণা, হৃদ্যতা ও সহানুভূতির বোধ জন্মে। সেই ভ্রাতৃত্ববোধ, হৃদ্যতা ও সহানুভূতি তৈরির প্রশ্নে গভীরভাবে অনুসন্ধান করে আমরা নবিজী (সা.) -এর একটি হাদীস পাই।
একদিন নবিজী সাহাবীদের উদ্দেশে নসিহত করতে গিয়ে বলেন— “তোমরা ঈমানদার না হওয়া পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর তোমরা পরস্পরকে ভালো না বাসা পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না।” নবিজীর কথা শুনে সাহাবীরা উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছেন। তখন নবিজি বললেন— “আমি কি তোমাদের এমন জিনিস বলে দিব না, যা করলে তোমাদের মাঝে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে?” সাহাবীরা অধীর আগ্রহে, কী সেই জিনিস! নবিজী সাথে সাথে বলে দিলেন— “তা হলো তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালামের প্রচার-প্রসার করো।”(সহীহ মুসলিম)। সালাম শুধু পরস্পর ভালোবাসা তৈরি করে এমন না; সালাম একটি পূর্ণাঙ্গ ও সওয়াবসম্বলিত ইবাদতও বটে। আমরা হাদীসে পাই—একদিন জনৈক এক ব্যক্তি নবী সা. এর কাছে এসে বলল “আসসালামু আলাইকুম”। নবিজী জবাব দিলেন এবং বললেন “সে ১০ নেকি পেয়েছে”। আরেকজন এসে বলল, “আসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ” বলল। নবিজী বললেন “সে ২০নেকি পেয়েছে”।
আরেকজন এসে “আসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু” বলল। নবিজী বললেন “সে ৩০ নেকি পেয়েছে”। (আবু দাউদ,তিরমিযী) বায়হাকী শরীফের একটা বর্ণনাতে এসেছে, নবিজী সা. বলেছেন— “যে ব্যক্তি আগে সালাম দেয় সে অহংকার থেকে মুক্ত”।
আমাদের সমাজে একটি প্রবণতা খুব বেশি যে, আমি যাকে চিনি কিংবা যিনি আমার পরিচিত তাকেই কেবল সালাম করব। অথচ আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. বলেন, এক ব্যক্তি নবী সা. কে জিজ্ঞেস করল, “ইসলামের কোন কাজটি উত্তম?” নবিজী বললেন, “তুমি মানুষকে খাবার খাওয়াবে এবং পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দিবে।” (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)। কে আগে সালাম দিবে, এক্ষেত্রে থিউরি হচ্ছে— “আরোহী পথচারীকে সালাম দিবে, পথচারী বসে থাকা ব্যক্তিকে সালাম দিবে, আর অল্প সংখ্যক লোক বেশি সংখ্যক লোককে সালাম দিবে।”(সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)। কাউকে যখন সালাম দেয়া হয় তখন তার ওপর জবাব দেয়া ওয়াজিব। আল্লাহ তাআলা সুরা নিসায় বলেন—”যখন তোমাদের সালাম দেওয়া হয়, তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম সালাম দাও অথবা অনুরূপ ফিরিয়ে দাও।” এমনিভাবে রাসূল সা. বলেন, “একজন মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের ৫টি হক আছে। তার মধ্যে একটি হলো, যখন সে সালাম দেয় তার জবাব দেওয়া।” (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)
আমাদের সমাজে আরেকটা ভুল ধারণা হচ্ছে—ছোটরা সবসময় বড়দের সালাম দেবে। কিন্তু হাদীসে আমরা দেখি স্বয়ং নবী সা. বাচ্চাদের সালাম দিতেন। নবিজীর খাদিম আনাস ইবনে মালিক রা. বলেন, “নবী সা. একবার আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন কিছু বাচ্চা খেলা করছিল। তিনি তাদের সালাম দিলেন। তাঁর ওফাতের পর আমিও যখনই বাচ্চাদের দেখতাম তাদের সালাম দিতাম। যাতে নবীজির এই সুন্নাহ মরে না যায়।” (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম) অন্য একটি হাদীসে এসেছে, আনাস রা. বলেন, “রাসূল সা. আমাকে বললেন, হে বৎস! যখন তুমি তোমার পরিবারের কাছে প্রবেশ করবে তখন সালাম দেবে। এটা তোমার জন্য এবং তোমার পরিবারের জন্য বরকত হবে।”(তিরমিযী, হাদীস)। সাহাবীরা সালামের জন্য এত উদগ্রীব ছিলেন যে, হযরত ইবনে উমর রা. কেবল সালামের জন্যই বাজারে যেতেন। নাফে রহ. বলেন, “আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. বাজারে যেতেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করত আপনি কি কেনা-বেচা করতে এসেছেন? তিনি বলতেন, না। আমি শুধু মানুষকে সালাম দেওয়ার জন্য এবং সালামের জবাব নেওয়ার জন্য এসেছি।”(আল হাদীস) সাহাবীরা সালামকে ব্যবসার চেয়েও বড় ইবাদত মনে করতেন!
একারণেই তো সাহাবাযুগের সমাজের চারিত্রিক রূপরেখা সব যুগেরচেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিল। তাঁদের মধ্যে হানাহানি, মনোমালিন্য ও বৈরীত্ব মনোভাবের পরিবর্তে সৌহার্দভরা সম্পর্ক, সহমর্মিতার অটুট বন্ধন ও সংহতিপূর্ণ পরিবেশের অন্যতম কারণ ছিল—সালামের ব্যাপক প্রচলন। তাঁরা শত্রু-মিত্র অভেদে সালাম দিতেন। তাঁদের সুস্থ সমাজের মতো আমাদের সমাজ গঠনে সালামের ব্যাপক প্রচলনের ভূমিকা অনন্য।
লেখক__শিক্ষার্থী: দারুল উলূম মাদানীনগর, ঢাকা।



