সময় ফুরিয়ে আসছে। আমি আবারও বলছি—সময় শেষ হওয়ার আগেই জেগে ওঠার সময় এখনই। ঐক্যবদ্ধ হতে ডাক দেওয়ার আগে আপনাকে একটি সহজ প্রশ্ন করি।
প্রতিদিন স্ক্রল করতে করতে আপনি যে মিমগুলো দেখে হাহা রিঅ্যাক্ট দিচ্ছেন, আপনি কি জানেন সেগুলো আসলে কারা বানাচ্ছে?
যে আপনার বন্ধু হিসেবে শেয়ার করল সে নয়, কিংবা যে বড় বড় পেজ নিজের ওয়াটারমার্ক বসালো তারাও নয়। তবে এই নিখুঁত মিমগুলোর আসল জাদুকর কে?
আমি অনেক খুঁজেছি, কিন্তু তাদের হদিস কেউই পায় নি। এগুলো হুট করে ইন্টারনেটে ‘সুনামি’র মতো চলে আসে—একেবারে সঠিক সময়ে, সঠিক শব্দে। আপনার মস্তিষ্ক কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেটি আপনার মনে একটি বিশেষ অনুভূতির জন্ম দেয়। আপনি ভাবছেন এটা স্রেফ কৌতুক? কিন্তু আমি যদি বলি, এগুলো এ পর্যন্ত তৈরি করা ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর এবং উন্নত মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র?
নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছিলেন, কেয়ামতের আগে জ্ঞান উঠে যাবে এবং মূর্খতা চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে।
এখন নিজেকে প্রশ্ন করুন, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে জ্ঞানের ছদ্মবেশে মূর্খতা ছড়ানোর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার কোনটি? নিউজ? না।
আমরা এখন অনেক স্মার্ট। আমরা ভাবি—”আরে ভাই, বিবিসি-সিএনএন তো এজেন্ডা চালায়, ওগুলো আমি দেখিই না!” অভিনন্দন! আপনি একটা বুলেট এড়িয়ে সরাসরি একটি মাইনফিল্ডে পা রেখেছেন। কারণ আপনি যখন নিউজ দেখা ছাড়লেন, তখন আপনার খবরের জায়গা দখল করে নিয়েছে ‘মিম’। প্রোপাগান্ডা আগে আসত গম্ভীর গলায়, সুট-টাই পরা মানুষের বক্তৃতায় আর এখন আসে মিমস হয়ে!
আপনি প্রশ্ন তুলতে পারতেন।
কিন্তু আপনি এমন কিছুর সাথে লড়াই করবেন কীভাবে যা আপনাকে হাসায়? আপনার মস্তিষ্ক যখন কোনো কিছু দেখে আনন্দ পায়, তখন সেটার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার ক্ষমতা সে হারিয়ে ফেলে। আর এটাই হলো আসল ট্র্যাপ।
আপনার মস্তিষ্কের সাথে আসলে কী ঘটছে জানেন? একে বলে ‘ডিসেনসিটাইজেশন’ বা অনুভূতিহীনতা।
মনে আছে যখন ‘এপস্টাইন ফাইল’ ফাঁস হলো? দুনিয়া জানতে পারল উচ্চবিত্তদের ভয়াবহ শিশু পাচার আর লালসার কথা। এটা নিয়ে মানুষের রাজপথে নামার কথা ছিল। কিন্তু ইন্টারনেট কী করল? এগুলো নিয়ে মজার ভিডিও আর মিম বানাতে শুরু করল। নরকের মতো ভয়াবহ একটি সত্যকে তারা স্রেফ ‘কৌতুক’ বানিয়ে আপনার নিউজফিডে ছেড়ে দিল।
ফলাফল? আপনি ভয়ংকর কিছু দেখলেন, কিছুটা শিউরে উঠলেন, তারপর মিম দেখে হেসে ফেললেন। ভয়টা চলে গেল। বারবার দেখার পর আপনি নিজেই সেটা নিয়ে জোকস বানানো শুরু করলেন। এভাবেই একটি জঘন্য অপরাধ স্রেফ ‘কন্টেন্ট’ হয়ে গেল।
কুরআনের সূরা আন-আম (আয়াত ৬৮) আমাদের পরিষ্কার বলেছে—যখন দেখবে মানুষ আল্লাহর আয়াত নিয়ে উপহাস করছে, তখন সেখান থেকে সরে যাও। আল্লাহ বিতর্ক করতে বলেননি, সরে যেতে বলেছেন। কারণ কিছু আলোচনা আলোচনা নয়, সেগুলো আসলে ‘দূষণ’।
মানুষ মনে করে মিমগুলো বুঝি আপনা-আপনি ভাইরাল হয়। না, ভাই! অ্যালগরিদম আপনার হাতে নেই। এই সিস্টেম সত্যকে নয়, বরং ‘এনগেজমেন্ট’কে পুরস্কৃত করে। আর রাগ, ভয়, লালসা আর উপহাসের চেয়ে বেশি এনগেজমেন্ট আর কিছুতে হয় না।
ইসলাম যে আবেগগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে বলেছে, সেই রাগ আর প্রবৃত্তিকে আজ আপনার বিরুদ্ধেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
৫ বছর আগেও ফেমিনিজম ছিল তাত্ত্বিক বিষয়। আজ মিমের কল্যাণে মুসলিম ছেলে-মেয়েরা একে অপরের প্রতিপক্ষ। একজন ‘আলফা মেল’ সাজার নেশায় নারীকে পণ্য ভাবছে, অন্যজন ‘ক্যারিয়ার’ এর নামে সংসার বিমুখ হচ্ছে। দুজনেই ভাবছে এটা তাদের ‘স্বাধীন চিন্তা’। কিন্তু আসলে একটি মিম আপনাকে শিখিয়েছে কী অনুভব করতে হবে। আপনি স্রেফ একটি স্ক্রিপ্ট অনুসরণ করছেন।
রোমানরা ২,০০০ বছর আগেই ফর্মুলা দিয়ে গিয়েছিল—”Bread and Circuses”। মানুষকে স্রেফ পেট ভরা খাবার আর বিনোদনে ডুবিয়ে রাখো, তারা কখনোই প্রশ্ন করবে না কে তাদের শাসন করছে। আজ সেই খাবার হলো আপনার ফোনের ‘ডোপামিন’ আর বিনোদন হলো আপনার ‘For You Page’।
দাজ্জালের ফিতনা কেন এত শক্তিশালী হবে জানেন?
কারণ সে আপনাকে জোর করবে না। মানুষ তাকে স্বেচ্ছায় অনুসরণ করবে। তারা মিথ্যাকে সত্য বলবে, মন্দকে বিনোদন ভাববে। মিম কালচার একটি পুরো প্রজন্মকে তৈরি করছে যাতে তারা চিন্তা না করে কেবল ‘ট্রেন্ড’ অনুসরণ করে। আজ নাচের ট্রেন্ড, কাল বিশ্বাসের ট্রেন্ড। এই ট্রেন্ডে হাঁটতে হাঁটতে যখন বড় প্রতারণাটি সামনে আসবে, তখন আপনার বিচারবুদ্ধি আর অবশিষ্ট থাকবে না।আমি আপনাকে অ্যাপ ডিলিট করে পাহাড়ে যেতে বলছি না। ইসলাম চোখ বুজে থাকার ধর্ম নয়। কিন্তু প্রতিবার কোনো মিম শেয়ার করার আগে ভাবুন—আপনি কার হয়ে কাজ করছেন? যখন কোনো সিরিয়াস বিষয় কৌতুক হয়ে যায়, তখন বুঝবেন লাভটা আপনার হচ্ছে না, অন্য কারো হচ্ছে।
নবীজি (সা.) বলেছিলেন—”ইসলাম শুরু হয়েছিল অপরিচিত হিসেবে এবং এটি আবার অপরিচিত হয়ে যাবে। তাই সেই অপরিচিতদের জন্য সুসংবাদ।” সেই ব্যক্তি হোন যে সবাই হাসলেও হাসে না, সবাই যখন স্ক্রল করে সে তখন চিন্তা করে।
ধোঁকা আসছে কি না সেটা বড় কথা নয়; বড় কথা হলো যখন ধোঁকা আপনার চোখের সামনে আসবে, তখন আপনি সেটা চিনতে পারবেন তো? নাকি হাহা রিঅ্যাক্ট দিয়ে স্ক্রল করে চলে যাবেন? সিদ্ধান্ত আপনার।



